শীত পড়লেই মনটা ছটপট করে বেড়াতে যাবার জন্য। তাই এক বন্ধু কে সাথে নিয়ে পৌঁছে গেলাম পাখি দেখতে বর্ধমান জেলা অন্তর্ভুক্ত কাষ্ঠশালি পাখিরালয়ে । কলকাতা থেকে মাত্র ১২০ কিমি দূরত্বে অবস্থিত এই স্থান পর্যটক মহলে "চুপির চর" নামে পরিচিত বেশি । স্থানীয় লোকের কাছে এটি ছাড়িগঙ্গা নামেও পরিচিত। এই স্থান হুগলী নদী থেকে কেটে যাওয়া অশ্বখুরাকৃতি একটি হ্রদ। শীতে নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে এখানে। 
অনেকে দিনে দিনে ঘুরে আসে। আমরা ঠিক করলাম শুক্রবার অফিস করে বিকালের ট্রেনে পূর্বস্থলি পৌঁছাব ও পরেরদিন ভোরে বেরিয়ে নৌকো করে পাখি দেখতে বেরোব । হটাৎ ঠিক হওয়ায় কোথাও থাকার জায়গা পারছিলাম না। তখন ইন্টারনেট ঘেঁটে একটি বিয়েবাড়ি ভাড়া দেয় এইরকম একটি বাড়ির (Dream Destiny অনুষ্ঠান হল) সন্ধান পেয়ে ফোন করলাম ও মালিকের সাথে কথা বলে থাকার ব্যবস্থা ঠিক করে ফেললাম। আমরা বিকাল ৫টার হাওড়া - কাটোয়া লোকালে যখন পূর্বস্থলি পৌঁছালাম তখন ঘড়িতে বাজে রাত ৮টা। সপ্তাহন্তে সবাই বাড়ি ফিরছে তাই ট্রেনে ঠাসা ভীড় ছিল। বেশ বেগ পেতে হল ভিড় ঠেলে উঠে আসন নিতে। অবশ্য আমাদের উৎসাহে তাতে এতটুকু খামতি হয়নি। ট্রেনে ফেরিওয়ালার থেকে চাল ভাজা, মিষ্টি, তিলের খাজা, চা খেতে খেতে সময় কেটে গেল। নবদ্বীপ স্টেশনের পর দুটো স্টেশন ছেড়ে পূর্বস্থলি। একে মফস্বল , তাতে আবার শীতের রাত, কেমন চারিদিক নিঝুম হয়ে পড়েছে। তাই হাঁটা পথ হওয়া সত্বেও আমরা স্টেশনে নেমে একটা টোটো তে করে হোটেলে পৌঁছালাম। একেবারে রেল লাইনের ধারে এক নম্বর প্লাটফর্মের শেষ প্রান্তের কাছে এই হোটেল। কেয়ার-টেকার কেষ্ট আমাদের ঘর দেখিয়ে দিয়ে রাতের খাবার আনতে চলে গেল। হাত পা ধুয়ে তৈরী হতে হতে কেষ্ট খাবার নিয়ে চলে এল। গরম গরম ভাত, রুটি, তরকারি ও মুরগীর ঝোল দিয়ে রাতের খাবার সারলাম। হোটেলের ম্যানেজার পরেরদিনের টোটোর বন্দোবস্ত করে দিলেন, যে আমাদের নিয়ে কাষ্ঠশালি ঘাটে যাবে ভোর ৫টায় । তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম পরেরদিন ভোরে উঠতে হবে বলে।
কাঁটায় কাঁটায় ভোর ৫টাতে টোটো এসে দাঁড়ালো হোটেলের দরজায় । বাইরে তখনো আকাশে আলো ফোটেনি। ঠান্ডা বেশি ছিল না কিন্তু মেঘলা থাকায় একটু শীত শীত ভাব ছিল। আমরা জবুথবু হয়ে টোটো তে উঠে বসে পড়লাম। চালকের নাম সুদর্শন । কথা বলতে জানলাম সে দিনের বেলায় টোটো চালায় আর রাতে নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে যায় । দেখলাম পূর্বস্থলির মানুষজনের ঘুম তখন ভাঙেনি। যখন নৌকা ঘাটে এসে নামলাম তখনও বেশ অন্ধকার । একজন মাঝি এগিয়ে আস্তে তাকেই জিজ্ঞাস করলাম কত ভাড়া নেবে বলে। জানলাম নৌকো বিহার করতে ঘন্টাপ্রতি দেড়শো টাকা ভাড়া পড়বে । দাম বেঁধে দেওয়া আছে আগের থাকতেই। ঠিক হল আকাশ একটু পরিষ্কার হলেই আমরা বেরিয়ে পরবো পাখিদের স্বর্গ রাজ্যে দেখতে । সুদর্শনের কাছে জানলাম যে আমরা পূর্বস্থলি ঘাট থেকে নৌকা ভাড়া নিয়েও ঘুরতে পারতাম। চুপির চর ও কাষ্টস্থালি এই দুই জায়গাকে নিয়ে গড়ে উঠেছে আনন্দনগর পর্যটনকেন্দ্র। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সহযোগিতায় স্থানীয় পঞ্চায়েত আর বর্ধমান জেলা পরিষদ পাখিরালয়টিকে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলেছে। ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৭০ টি প্রজাতির পাখি এসে ডেরা বাঁধে এখানে। পুরো হ্রদ ঘুরে দেখতে সময় লাগে ছয় থেকে সাত ঘন্টা। হাতে তিন বা চার ঘন্টা থাকলেও যথেষ্ট।
আলো ফুটতেই পাখির কলকাকলি কানে এল। নৌকায় উঠে পড়লাম। মাঝির নাম হারাধন। জানতে চাইলাম পাখি চেনে কিনা। মাথা নেড়ে বলল সে পাখির নাম সব জানে, শিখেছে পর্যটকদের কাছ থেকে। আর জানলাম এই হ্রদ খুব একটা গভীর নয়। আট থেকে নয় ফুট গভীর কোথাও কোথাও। নৌকায় ভেসে বেড়াতে বেড়াতে খুব কাছ থেকে দেখলাম বহু প্রজাতির পাখি যেমন ডুবুরি হাঁস, পানকৌড়ি , মাছরাঙা, বালিহাঁস , সরাল , বাহ্মনী ডাহুক, বক, সুচিপুচ্ছ আরও কত নাম জানা, অজানা বহু পাখি। সাদা বকের ঝাঁক মাথার উপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখলাম । লাল মাথা গোলাপি ঠোঁটের রাঙ্গামুড়ি দেখতে পেলাম আমাদের মাঝির জন্য । পাখি বসবে বলে কিনা জানি না, তবে দেখলাম হ্রদের মধ্যে অনেক জায়গায় বাঁশ পোঁতা আছে। যাতে অন্য পাখি ছাড়াও নীল মাছ রাঙা ও পানকৌড়ি এসে বসেছে । পরিযায়ী হাঁসের ঝাঁক অনবরত পাক খাচ্ছে মাথার উপর দিয়ে। কয়েকটা চাতক পাখির সেকি ব্যাস্ততা। মাথার উপর ঘুরে পাক খাচ্ছে আর সজোরে এসে জলে ডুব দিচ্ছে। নৌকা ভেসে চলেছে কচুরিপানার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। দেখলাম কচুরিপানার মধ্যে দিয়ে গলা উঁচু করে দেখছে নাম না জানা একটি নীল পাখি। যেইনা ক্যামেরা তাক করেছি অমনি ডানা মেলে উড়ে গেল। কিছুদূরে লেসার হুইসিলিঙ হাঁসের দল ভেসে বেড়াচ্ছে। অত্যন্ত সতর্ক। আমাদের নৌকা এগিয়ে যেতেই উড়ে গিয়ে স্থান বদল করল । ইতিউতি ভেসে বেড়াচ্ছে বেশ কয়েকটি জেলে নৌকো। জাল ফেলে মাছ ধরছে। দেখা যায় কাছে পিঠের গ্রামের লোকেদের রোজকার কাজও । হটাৎ বৃষ্টি শুরু হয়ে যাওয়াতে আমাদের নৌকা বিহার সময়ের আগেই শেষ করতে হল । এবার নৌকা এসে যেখানে ভিড়ল সেইখানে বর্ধমান জেলা পরিষদ একটি নজরমিনার তৈরি করেছে। সেটি বন্ধ ছিল, কিন্তু নিচে দাঁড়িয়েই বুঝলাম যে উপর থেকে জলাভূমির বিস্তার দারুন লাগবে দেখতে । বেশ জোরে বৃষ্টি পড়ছিল। আমরা একটা সিমেন্টের ছাতার তলায় আশ্রয় নিলাম। আরো কিছুটা সময় নৌকাতে কাটাবার ইচ্ছে ছিল কিন্তু নিম্নচাপের বৃষ্টি, সেতো থামার নয়, তাই বৃষ্টি একটু ধরতে হ্রদের পার বরাবর হেঁটে প্রধান ঘাটে ফিরলাম। আবার জোরে বৃষ্টি নামতে টোটোওয়ালা কে ফোন করলাম যাতে সে এসে আমাদের নিয়ে যায়। দেখলাম আমাদের পরে যারা ঘাটে পৌঁচেছে তাদের আর নৌকা বিহার করা হল না বৃষ্টির জন্য। শুনলাম জানুয়ারী মাসে নাকি আরো পাখি আসে। তাই তখনি ঠিক করে ফেললাম আগামী মাসে আবার আসব পাখি দেখতে।
হাতে অনেক সময় থাকায় পারুলিয়া বাজারে গেলাম গুড় কিনতে। সেখানে জলখাবার খেয়ে খেঁজুরের টাটকা ঝোলা গুড় ও পাটালি কিনে দুপুর ১১ টার কাটোয়া-হাওড়া লোকাল ধোরে ফিরলাম হাওড়া তে। তখন কানে শুধু পাখির গান ভাসছিল।
কিভাবে যাবেন:
কলকাতা থেকে সড়ক পথে দুরুত্ব ১২০ কিঃমিঃ। এছাড়া শিয়ালদা বা হাওড়া থেকে কাটোয়া লোকালে এসে নামতে হবে পূর্বস্থলি স্টেশনে। স্টেশন থেকে মিনিট ২০ দুরুত্বে চুপির চর। স্টেশন থেকে টোটো পাওয়া যায়। কলকাতা থেকে গাড়িতে এলে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে কৃষ্ণনগর হয়ে নবদ্বীপে আস্তে হবে। সেখান থেকে পারুলিয়া মোড় হয়ে পূর্বস্থলি পৌঁছানো যায়।
কোথায় থাকবেন:
পরিযায়ী আবাস - ৯৭৩২১ ৪২৩৬২
ড্রিম ডেসটিনি - ৮৩৪৮১ ৬৯৮৪৪
টোটো বা মাঝির দরকার হলে যোগাযোগ করতে পারেন :
সুদর্শন - ৭৩১৯২০৯৬৮৫
হারাধন মন্ডল - ৯৬৩৫৫ ৪৭৪৮৫

No comments:
Post a Comment