মার্চ
মাসের ২৪ তারিখ ক্রিয়া যোগা এক্সপ্রেসের স্লীপার ক্লাস এ সওয়ার হলাম আমরা চার বান্ধবী ও আমার
সঙ্গী ক্যামেরা। ট্রেন ছাড়ল রাত ১০:১০ মিনিটে ।
আমরা নামব সুইসা স্টেশনে। গন্তব্য পুরুলিয়া জেলার অযোদ্ধা পাহাড়। ঘুম হলো না সারা রাত পাছে ঘুমিয়ে পড়ি আর যদি স্টেশনে নামতে না পারি। তাকিয়ে রইলাম ট্রেনের বাইরে খোলা জানালা দিয়ে। সবে দোল পূর্নিমা গেছে, চারিদিক চাঁদের আলোয় আলোকিত হয়ে আছে আর তারসাথে
মিলে আছে শাল, শিমূল, আর মহুয়ার গন্ধ। ট্রেনের কামরার মধ্যেও সেই গন্ধ একটা অদ্ভূত মাদকতা এনেছিল।
![]() |
| Charida Village |
ঠিক চান্ডীল স্টেশন আসতেই
আমরা দরজার কাছে এসে দাঁড়ালাম। নামলাম
সুইসা স্টেশনে ভোর ৪:১০ মিনিটে। পুরো ট্রেন
থেকে সুধু আমরাই চারজন নামলাম ঘুটঘুটে অন্ধকারের
মধ্যে। তখনো আকাশে ভোরের আলো ফোটেনি, রীতিমত অন্ধকার। আমরা জড়সর হয়ে কোনদিকে এগোব যখন বুঝতে পারছিলাম না সেই মুহুর্তে শুনতে পেলাম কেউ আমাদের ডাকছে স্টেশন
ঘরের দিক থেকে। আমাদের গাড়ি বলা ছিল, তাতে আমরা রওনা হলাম ২০ কিমি দুরের বাঘমুন্ডির দিকে। কিছুদুর যেতে গাড়ির আলোয়
দেখলাম যে আমরা মাটির রাস্তা দিয়ে চলেছি আর রাস্তার দুধারে প্রচুর পলাশ পরে আছে। মনটা
ভরে গেল। কিছুদুর যাবার পর দেখলাম দুটি শেয়াল
হটাৎ রাস্তা পেরোলো।
বাঘমুন্ডি
থেকে ৩ কিমি আগে চরিদা গ্রামে ঢোকার মুখে
দেখলাম বাঁশ দিয়ে ঘিরে আলো জালিয়ে "ছৌ নাচ" হছে, আর গ্রামের প্রচুর লোক ভিড় করে তা দেখছে। গাড়ি থামিয়ে নেমে
পড়লাম ছবি তলার লোভে। সুনলাম সারা রাত ধরে চলছে এই অনুষ্ঠান। এই চরিদা গ্রাম মুখোশ শিল্পের পীঠস্থান। পদ্মশ্রী
পাওয়া শিল্পী শ্রী গম্ভীর সিংহ মুন্ডার বাড়িও
এখানে। এই গ্রামের রাস্তার দুধারে মুখোশ তৈরি ও বিক্রি হয়।
| A view of Ajodhya Hill |
আমরা
বাঘমুন্ডি তে Chhowburu Tourism এর মালিক শ্রী
সুজিত চন্দ্র কুমারের হোমস্টেতে উঠলাম। হাঁসি মুখে আমাদের আপ্পায়ণ করলো পৌঁছাতেই। আমাদের একটা চার শয্যার বড় ঘর দিয়েছিলো । আমরা টানটান
হয়ে শুয়ে পরলাম ঘন্টা খানেকের জন্য। ঘুম ভাঙ্গতে চা আর বিসকুট এলো। সুজিতের বাড়িথেকেই অযোধ্যা পাহাড় দেখা যায়। শাল, শিমূল, সিরিশ, সেগুন, মহুয়া আর পলাশে ছাওয়া
সবুজ উপত্যকা। ঋতুভেদে রঙ বদ্লায় অযোধ্যার।
অসংখ্য গিড়ি-সিরা, ছোট-বড় পাহাড়ি ঝোরা; গহীন
বন। এই নয়নলোভন প্রকৃতির মাঝে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে
নানান গিরি শিখর , উচ্চতম গর্গাবুরু (২৮৫০
ft). জলখাবার খেয়ে তৈরি হয়ে আমরা বেরিয়ে পরলাম আমাদের চালক এবং গাইড শংকরের
সাথে। ভারী আমুদে ছেলে শংকর। কিছুক্ষনের মধ্যে মন জয় করেনিলো সবার।
| Turga Falls |
আমাদের নিয়ে ও আজ চলল অযোধ্যা পাহাড়ের উপর
তুরগা ও বামনি বাঁধ দেখাতে। বাঘমুন্ডি থেকে অযোধ্যা পাহাড়ের দুরত্ব ১৬ কিমি। গাড়ি পাকদন্ডি বেয়ে বেশ
কিছুটা উঠে একটা জায়গায় থামলো। আমরা রাস্তা
ছেড়ে পাথরের ধাপ বেয়ে কিছুটা নামতে নিচে দুরে দেখতে পেলাম অরণ্যে ঘেরা তুর্গা বাঁধের
পান্না সবুজ জলের লেক। আর আমাদের ঠিক ডানদিকে নিচে তুর্গা জলপ্রপাত। আমরা শংকরের সাহায্যে ধীরে ধীরে ছোটো বড়
পাথর টপকে ঝরনার ধারে পৌঁছালাম। খুব সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছিল পিছলে যাওয়ার ভয়। বর্ষা নয় বলে খুব বেশী জল ছিল না কিন্তু বর্ষার সময় ভয়ংকর আকার নেয় সেটা
বুঝতে অসুবিধা হলনা। কিছুটা সময় আমরা ওখানে কাটিয়ে উপরে রাস্তায় উঠে এলাম শংকরের সাহায্যে।
| Bamni Falls |
এবার
যাব আমরা বামনি জলপ্রপাতের দিকে। আবার আমাদের নিয়ে গাড়ি পাকদন্ডি বেয়ে এগোতে থাকল।পথে
প্রচুর পলাশ ফুটে থাকতে দেখলাম আর দেখলাম আদিবাসি মেয়ে বউ রা গাছ কেটে মাথায় কাঠ নিয়ে
যাছে জ্বালানির জন্য। কি সুন্দর ছন্দে হেঁটে যাচ্ছে ওরা রাঙ্গা মাটির রাস্তা দিয়ে।
তাকিয়ে থাকলাম ওদের চলে যাবার পথের দিকে। দেখতে
দেখতে গাড়ি এসে দাঁড়ালো বামনি জলপ্রপাতের কাছে। এখানে ঠান্ডা পানীয় ও শশা বিক্রি হছিল।
বেশ অনেকটা নামতে হলো পাথরের ধাপ বেয়ে ঝরনার প্রথম স্তরে । সেখানে বহু লোক স্নান করছিল।
শংকরের উৎসাহে আমরা আরো নামতে থাকলাম ঝরনার শেষ প্রান্তে যাব বলে। রোদের তেজ প্রখর থাকায় বেগ পেতে হচ্ছিল । অতি সুন্দর এই অরন্যে ঘেরা জায়গাটি ।
বড় বড় পাথর পরে আছে এদিক সেদিকে। আর একদিকে পাহাড়ের গা বেয়ে ঝরনার জল অসম্ভব গতি তে নেমে আসছে। আমরা এখানে স্নান করলাম
মন ভরে। পিকনিক করার জন্য আদর্শ জায়গা তুর্গা
ও বামনি জলপ্রপাত। প্রকৃতি প্রেমী ও ফটোগ্রাফার
দেরও আদর্শ স্থান।
সেইদিন বিকালবেলায় আমরা গেলাম আপার ও লোয়ার ড্যাম দেখতে শংকরের গাড়িতে। দুটিই জল
বিদ্যুত প্রকল্প। বাঁধের দুই ধার বড় বড় পাথর দিয়ে বাঁধানো। আপার ড্যাম
থেকে চারিপাশের দৃশ্য অতন্ত্য মনোরম।
ঘন সবুজ অরণ্যে ঘেরা চারিপাশ। ক্যামেরা বন্দী
করলাম সূর্যাস্তের অসাধারণ রূপ।
| Upper Dam |
দ্বিতীয় দিন সকাল সকাল আমরা গেলাম অযোধ্যা
পাহাড়ের উপর সুন্দর সাঁওতাল গ্রামে , নাম রাঙ্গা
গ্রাম। ছবির মতো সাজানো গ্রাম। মাটি দিয়ে
নিকানো ঘর দোর।এদিকে প্রচুর মহুয়া গাছ। সাঁতাল
মেয়ে ও বউ রা মাথায় ঝুড়ি কোরে মহুয়া ফল নিয়ে চলেছে ফুটিয়ে স্থানীয়
সুরা বানাবে বলে। এখানে আমরা মুড়ি আর আলুর চপ দিয়ে প্রাতরাশ সারলাম। পথে পড়ল তারপেনিয়া লেক। মাটি কাটার ফলে তারার আকার নিয়েছে এই লেক। লেকের পারে যাওয়া যায় কিন্ত উপর থেকে দেখতে খুব সুন্দর লাগে। এরপর আমরা চললাম ঝাড়খান্ডের মুর্গুমা লেকের দিকে। চারিদিকে পলাশের জঙ্গল। দেখে
মনে হচ্ছিল বনে আগুন লেগেছে।
| Tarpania Lake |
বিকালে আমরা ১১কিমি দুরত্যে খয়রা নদীর উপর
অর্ধচন্দ্রাকৃত খয়রাবেরা ড্যাম দেখতে গেলাম।
খুব সুন্দর জায়গা। ছেলেরা মাছ ধরছিল।
শুনলাম এখানে হাতিদের আনাগোনা হয় ফসলের সময়
। লেকের ধারে থাকার ব্যাবস্থা আছে। সন্ধ্যাবেলা
মাত্র ৫০০ টাকার বিনিময় আমাদের জন্য
ছৌ নাচের আয়োজন করেছিল সুজিত। আরো অন্যান্য হোটেলের লোকেরাও এসেছিল। মাঠে বাঁশের
উপর আলো লাগিয়ে ঘেরা হয়েছিল। বাঁশি, মাদল,
ধামসার সাথে শিব, পার্বতী, গনেশ, কার্তিকের মুখোশ পরে একে একে শিল্পীরা নাচ ছিল। আমরা
সবাই উপভোগ করলাম।
| Khayarabera Dam |
তৃতীয় দিন সকালে যাই আর একটি সাঁওতাল গ্রামে
। গ্রামের নাম তিকার্তন, এটাও ভারী সুন্দর
একটা শান্ত নিরিবিলি গ্রাম। এখানে আমি ক্যামেরা বন্দী করলাম বেশ কিছু সুন্দর মুহুর্ত।
এখান থেকে আমরা যাই ডাওরী খাল ঝর্না
দেখতে। রৌদ্র মাথায় করে কখনো ধান খেতের উপর দিয়ে, কখনো আলের উপর দিয়ে প্রায়
২ কিমি টানা হেঁটে আমরা ডাওরী খালে পৌঁছাই। বড় বড় পাথরে ঘেরা একটা জায়গা যার চারিপাশে
গভীর অরণ্য।এক ফোঁটা জল ছিল না ঝর্নাতে কিন্তু আমাদের বুঝতে অসুবিধা হলো না যে এই জায়গা
বর্ষায় ভয়ংকর রূপ ন্যায়। এখানে আমি আমার সঙ্গীদের থেকে কিচুক্ষণ আলাদা হয়ে ক্যামেরা
বন্দী করলাম প্রকৃতির কিছু সুন্দর রূপকে। অনেকটা
সময় কাটিয়ে আমরা ওখান থেকে ফিরলাম একই পথ ধরে। তখন তেষ্টায় গলা ফেটে যাছিল আমাদের।
সেইদিন
বিকালেই সাঙ্গ হলো আমাদের অযোধ্যা সফর এবারের মতো। আমরা ৬৫ কিমি দুরে পুরুলিয়া পৌঁছে হাওড়া -চক্রধরপুর
প্যাসেনজার ধরে পরের দিন ভোরে হাওড়া পৌঁছালাম।
বারাভুম থেকেও এই ট্রেন ধরা যায়।
কি ভাবে যাবেন:
Kriya
Yoga Exp Dep: 22:10 Arrv: 04:09 Howrah to Suisa (Suisa to Baghmundi by car distance 20 km)
Howrah
- Purulia Exp Dep: 16:50 Howrah to Purulia (Purulia to Baghmundi by car distance 65 km)
Howrah
- Chakradharpur Passenger Dep: 23:05 Arrival 06:59 Howrah to Barabhum (Barabhum
to Baghmundi by car distance 25 km)
কোথায় থাকবেন :
Chhowburu Home Stay
(09732294515), Sonkupy Banjara Camp (09732294515)
এখানে আগে থাকতে জানালে গাড়ির
ব্যবস্থা করে দেবে
| A Tribal lady |
