Sunday, 13 May 2018

Thailand - Kravy, Ko Phi Phi and Bangkok

আমি, বাবা, মা, আর আমার স্বামী চারজন মিলে ভোরের বিমানে থাইল্যান্ডের রাজধানি ব্যাংককের উদ্যেশে রওনা হলাম। কলকাতা থেকে প্রতিদিন বিমান যাচ্ছে ব্যাংককে। মাত্র আড়াই ঘন্টার উড়ান। ভারতীয় সময়ের থেকে থাইল্যান্ডের সময় দেড় ঘন্টা এগিয়ে। ঠিক ছিল আমরা ব্যাংকক  থেকে বিমান  বদলে সোজা ক্র্যাবি যাব।  ব্যাংককে দুটি বিমানবন্দর - সুবর্ণভূমি ও ডন ম্যূয়াং। আমরা ডন মুয়াং বিমানবন্দরে  থেকে  ক্র্যাবি গামী বিমান  ধরলাম। ব্যাংকক থেকে ক্র্যাবি যেতে দেড় ঘন্টা লাগল । 

বিমানবন্দর থেকে নিয়ে যেতে রিসোর্ট থেকে গাড়ি পাঠিয়েছিল। ক্র্যাবি  থাইল্যান্ডের দক্ষিনের একটি রাজ্য। কিছুক্ষনের মধ্যেই আমাদের নিয়ে গাড়ি ছুটল ঘন সবুজ জঙ্গল ও পাহাড়ে ঘেরা ঝাঁ-চকচকে মসৃন রাস্তা দিয়ে। ড্রাইভার ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে জেনে নিলো আমাদের দুপুরের খাওয়া হয়েছে কিনা। কলকাতায় হাল্কা ঠান্ডা ছিল।  এখানে  শীততাপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে বসে বাইরের তাপমাত্রা টের পাচ্ছিলাম না। ড্রাইভার আমাদের নিয়ে গেল গ্রামের  একটা ছোট্ট রেস্তোরাঁ তে। এবার টের পেলাম বাইরে বেশ গরম ।  কিন্তু চারপাশে গাছ গাছালি থাকায় কষ্ট তত হল না। এখানে আমরা থাইল্যান্ডের স্পেশাল খাবার পদ-থাই খেলাম। অনেকটা চাইনিজ  চাউমিন ও ফ্রাইড রাইসের মত। পলাশ ফুল ফুটে থাকতেও দেখলাম এখানে। আর সাথে কোকিলের ডাকে পুরো বসন্তের আমেজ আনল মনে। সবুজে সাজানো ক্র্যাবির প্রধান আকর্ষণ অপূর্ব প্রকৃতি ও একাধিক সাগরসৈকত।

আমাদের রিসোর্ট "বিয়ন্ড ক্রাবি" - ক্র্যাবি টাউনের  উত্তর পশ্চিম দিকে Klong Muang সৈকতে। কিছুক্ষনের মধ্যে গাড়ি রাস্তা ছেড়ে রিসোর্টের  গেটে  ঢুকে পড়লো। বেশ কয়েকটি স্বতন্ত্র কটেজ ও সুন্দর সাজানো বাগানের ভেতর  দিয়ে এসে দাঁড়ালো লবির বাইরে ।  আমরা নেমে রিসেপশনে ঢুকতে টের পেলাম আমরা পাঁচ তলার উপর দাঁড়িয়ে আছি। চোখ গেলো কাঁচের বাইরে স্বচ্ছ পান্না রঙা আন্দামান সাগরের  দিকে। চারিদিকে ছায়া মেলেছে নারকেল, ক্যাসুরিনা, রবার, আম  সহ  নানা গাছগাছালি। আর রয়েছে সবুজে মোড়া অজস্ৰ  টিলা পাহাড়।  আমরা ঠিক রিসেপশনের নিচের তলায় পাশাপাশি দুটো সি ভিউ রুম পেলাম । হোটেল আগেথেকেই অনলাইনে  বুক করা ছিল।রিসোর্টটি চমৎকার  জায়গায় অবস্থিত।  আমরা ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালাম।  সামনে সমুদ্র আর নিচে সুন্দর বাগান ও তার সংলগ্ন  লম্বা সুইমিং পুল। সাগরতট ও পুলে  রঙিন ছাতার নীচে ডেকচেয়ারে সব বিদেশিরা রোদ পোয়াচ্ছে।  পুলের ৩০ মিটার ব্যাবধানে রুপোলি বালির সৈকত । বাইরে রোদ্দুর চড়া থাকায় আমরা ঘরে ঢুকে বিশ্রাম নিলাম কিছুক্ষন। বাইরে সৌন্দর্য্যের হাতছানি এতটাই যে বেশিক্ষন ঘরে থাকাও গেলো না।  আমরা নিচে রিসোর্টের  সমুদ্রের ধারে কাফে তে বসে বিয়ারের মগে  চুমুক দিতে দিতে সামনে ঢেউয়ের খেলা  উপভোগ করতে লাগলাম। এখান থেকে আন্দামান সাগরের বুকে সূর্যাস্তের দৃশ্য অনবদ্য।  সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত মাদকতার  সৃষ্টি হয়। 

এখানে সমস্ত হোটেল ও রিসোর্টে  আছে থাই ম্যাসাজ পার্লার । আর দেখলাম আমাদের রিসোর্ট সংলগ্ন এবং সমুদ্রের ধারে একটি সুন্দর খোলা জায়গায় থাই ম্যাসাজের  ব্যবস্থা। যত্ন সহকারে ও রিসোর্টের তুলনায় অনেক সস্তায় এখানে ম্যাসাজ  করালাম । এই পার্লারের সামনে বিচের উপর একটি গাছের উপর থেকে  দড়ির দোলনা ঝোলানো । ভারি ভালো লাগল সাগর পাড়ে দোল খেতে।

পরেরদিন সূর্য্য উদয় দেখবো বলে আমরা খুব ভোরে উঠে সমুদ্র সৈকতে গেলাম।  উত্তর-পশ্চিম দিকে অবস্থিত হওয়ায়, সূর্যের দেখা মেলে দেরিতে। কিন্তু পাহাড়ের আড়াল থেকে যে রঙ  ছড়ায় পুবের আকাশে তা দেখলে মনে হবে কেউ যেন নানা রঙের আবির লেপে দিয়েছে আকাশের গালে।  আমরা আরো উত্তরে হাঁটলাম বিচের উপর দিয়ে । জল সরে যাওয়ায় খুব সহজেই পায়ে হেঁটে খুব কাছে সবুজে মোড়া একটি ছোট দ্বীপে পৌঁছালাম। ভারী চমৎকার লাগে চারপাশের সৌন্দর্য্য । এখানে বেশ কয়েকটি রঙিন নৌকা বাঁধা। অনেকটা আমাদের দেশের নৌকার মতো কিন্ত পেছন দিকটা  ল্যাজের মতো উঁচু ও লম্বা, আর খুব সুন্দর সাজানো। এইগুলোকে থাইল্যান্ডে লং টেল  বোট  বলে। সূর্য ওঠার সাথে সাথে সাগরের জল  এগিয়ে আস্তে থাকলো। আমরাও তাড়াতাড়ি দ্বীপ থেকে চলে এলাম মূল ভূ-খণ্ডে ।  আসার সময় হাঁটু জল পার হয়ে আস্তে হল।  যে নৌকা গুলো বালিতে আটকে ছিল, ফেরার সময় দেখলাম সেগুলো দুলছে জল পেয়ে । বেলা বাড়তে দ্বীপটি আবার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো ।

আজ  ফি ফি দ্বীপে যাবো ঠিক ছিল । সেখানে একরাত্রি কাটিয়ে পরেরদিন বিকালে ফিরে আসব। সেইমতো রিসোর্টের ট্রাভেল ডেস্কঃ থেকে আগাম টিকিট কাটা ছিল। ক্র্যাবির পশ্চিমে আন্দামান সাগরের সুনীল জলরাশির মাঝে জেগে রয়েছে ফি ফি দ্বীপ। ফি ফি দ্বীপে যাওয়া যায় ফুকেট অথবা ক্র্যাবি থেকে।  ফি ফি দ্বীপের আশে পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আরও নানা দ্বীপ। আমরা কয়েক বছর আগে এই  দ্বীপে দিন কয়েক  কাটিয়েছিলাম। সেবার আমরা ফুকেট থেকে গিয়েছিলাম। ফি ফি দ্বীপপুঞ্জ ক্র্যাবি রাজ্যের  অন্তর্ভুক্ত এবং  জলপথে  দূরত্ব মাত্র ৩৮ কিঃ মিঃ। সকাল আটটায় তৈরি হয়ে আমরা হোটেলের লবিতে গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। গাড়ি অন্যান্য হোটেল থেকে লোক তুলে তারপর আমাদের নিয়ে  চলল  আওনাং -এর "নপারাৎ থারা" ফেরিঘাটে। এখান থেকে ফি ফি দ্বীপে যাবার স্পিড বোট ও ক্যাটাম্যারন লঞ্চ ছাড়ে। যেখানে নামলাম সেটি খুব জনবহুল জায়গা এবং প্রত্যেকেই কোথাও না কোথাও যাবার উদ্যেশে বোট ধরতে এসেছে। এখানে প্রথমে আমাদের পাসপোর্ট দেখতে চাইলো। তারপর নম্বর দেওয়া কমলা রঙের গোল স্টিকার লাগিয়ে দিলো এক এক করে সবার জামার বুকে। আমরা সামনে দাঁড়ানো একটি দুতলা লঞ্চে  উঠলাম, তার নাম আওনাং প্রিন্সেস । বড়  দোতলা লঞ্চ, একতলা ও দুতলা তে শীততাপনিয়ন্ত্রিত বসার সু-ব্যবস্থা। আমরা সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম একেবারে উপরের ডেকে।  এখানেও বসার ব্যবস্থা আছে। আমরা ছাড়া কোনো ভারতীয় ছিলনা।  লঞ্চটা  দাঁড়িয়েছিল একটি খাঁড়ি  তে। ডেকে দাঁড়িয়ে প্রচুর ছোট-বড় নানা রঙের নৌকো আস্তে ও যেতে দেখলাম। নির্ধারিত সময় আমাদের লঞ্চ  ভেঁপু বাজিয়ে ছাড়ল  ও এগিয়ে চলল  দক্ষিণ-পশ্চিম মুখ।  এগিয়ে চলল ছোটবড় সমুদ্র থেকে মাথা উঁচু করে থাকা পাহাড়ের পাশ কাটিয়ে । বেশ লাগছিল। নানা ভঙ্গিমায় ফটো তুললাম সবার। অল্প কিছুদূর যাবার পর মাঝ সমুদ্রে নোঙ্গর ফেলে দাঁড়ালো আমাদের লঞ্চ, আরো যাত্রী তুলবে বলে। রাইলি, ফ্র্যানাং বিচের থেকে যাত্রীরা এল লং টেল বোটে চড়ে। বেশ গরম ছিল কিন্তু অপূর্ব সৌন্দর্য্য ও সাথে সমুদ্রের হাওয়া থাকায় খুব একটা টের পেলাম না সেটা ।  ঘন্টাখানেক চলার পর আস্তে আস্তে সামনে ফি ফি  দ্বীপ স্পষ্ট হতে থাকল।  হটাৎ মনে হবে বুঝি কোন সুবিশাল দূর্গ সমুদ্র থেকে মাথা তুলে আমাদের অভর্থনা জানাচ্ছে। প্রথম দর্শনেই চোখ জুড়িয়ে গেল । বামদিকে "ফি ফি লে" দ্বীপকে রেখে লঞ্চ থামল  টনসয় বের  ফেরিঘাটে ।  গোটাকয়েক  লঞ্চ আর বেশ কিছু নৌকো নোঙর করা। আর সমুদ্রের পান্না সবুজ জলে ভেসে আছে ছোট বড় নানা রকমের রঙিন নৌকা। এই ফি ফি দ্বীপে প্রায় কয়েকশো লোকের মৃত্যু হয়েছিল ২০০৪ এর সুনামিতে। সমস্ত হোটেল, দোকানপাট, বাজার ধংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল গোটা দ্বীপ। এক যুগ পরে তার কোনো চিহ্ন থাকার কথা নয়। শুনেছি দু-তিন বছরের মধ্যে  যারা এসেছিলো তারাও ধ্বংসাবশেষ দেখতে পায়নি। সুনামির পর সবই নতুন করে তৈরি হয়েছে। প্রচুর আয় হয় ট্যুরিজম থেকে তাই এতো উন্নতি হয়েছে । 

ফি ফি ডন ও ফি ফি লে  নিয়ে ফি ফি দ্বীপপুঞ্জ। ফি ফি ডনের গড়ন অনেকটা ডাম্বেলের মতন যার মাঝের সরু অংশটা মাত্র ১৫০ মিটার চওড়া।  সরু অংশটার  এক ধারে  টনসয় বে, আরেক ধারে  লো-দালুম বে  আর দুই ধারেই সমুদ্রসৈকত । মাঝে ঠাসা অজস্ৰ হোটেল, রেস্তোরাঁ, ট্যাটু বার , থাই ম্যাসাজ পার্লার, জামাকাপড়ের ও স্যুভেনির দোকান। এই দ্বীপে কোন গাড়ি নেই, তাই সব পায়ে চলার রাস্তা। আমরা এগিয়ে চললাম টনসয় গ্রামের ভেতর দিয়ে  চেনা রাস্তা ধরে, যার ডান পাশে  বিচের ধারে সারি সারি  থাই খাবারের রেস্তোরাঁ । রাস্তার বাম ধারে থাকার বিভিন্ন মানের সব হোটেল, ট্রাভেল এজেন্টদের অফিস, ম্যাসাজ পার্লার, আর কতকীছু  দোকানপাট  ।  পথ চলার সময় অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম পেছনে  একটা  "পি-পি পি-পি" আওয়াজ কানে আসতে । দেখলাম এক ঠেলা বোঝাই মাছ নিয়ে একটি লোক এগিয়ে যাবে বলে পাস চাইছে ।  এটাই এখানের হর্ন!  আমরা একটি রিসোর্টে উঠলাম তার নাম বানিয়ান ট্রি । ঠান্ডা তরমুজের শরবত দিয়ে  আমাদের অভর্থনা জানাল। 

ফি ফি ডন এর উচ্চতম জায়গা ফি ফি ভিউ পয়েন্ট। এই ভিউ পয়েন্টর উচ্চতা মাত্র ১৮৬ মিটার ।  কিছুটা পায়ে হাঁটা রাস্তা ও তারপর কংক্রীটের খাড়া সিঁড়ি পাহাড়ের উপর উঠে গেছে। পথের ধারে বিশ্রাম নেওয়ার জায়গাও আছে। উপর থেকে পুরো দ্বীপটার  সৌন্দর্য্য অসাধারণ।  এখান থেকে ফি ফি লে  দেখা যায় আর দেখা যায়  টনসয়  গ্রাম ও লোহা ডালুম বে। এখানে আসার সেরা সময় সকাল ৯.০০ টার মধ্যে । সেই সময় সূর্যের নরম আলোয় চারিধার রহস্যময় দেখায়  ।  ভিউ পয়েন্টের ওপর দিক থেকে আরো তিন টি রাস্তা নেমে গেছে  দ্বীপের অন্যান্য প্রান্তে যাবার জন্য। সাধারণত স্থানীয় বাসিন্দারা এই সব রাস্তা ব্যবহার করে থাকে । ভেবে ছিলাম উপরে চড়ব কিন্তু রোদ্দুর বেশ চড়া থাকায় আর ইচ্ছে করল  না।  

দুপুরের আহার সারলাম একটি বিচের উপর থাই খাবারের রেস্তোরাঁ তে। এখানে ৬৫০ গ্রামের একটা sea bass খেলাম। অনেকটা খেতে আমাদের ভেটকি মাছের মত। বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে দিয়েছিলো পাতে।   বিকালে রোদ পড়তে গেলাম টনসয়  এর  ওপর দিকে  লো-দালুম  বে তে ।   প্রচুর বিদেশীর আনাগোনা এখানে। ভারতীয় নেই বললেই চলে।  এখান থেকে  টুকিটাকি কেনা কাটা সেরে ফেললাম।  সন্ধে নামতে দোকানপাটে আলো জ্বলে উঠল।  দেখলাম দোকানিরা তেল ভোরা কাঁচের বোতলে আগুন  জ্বালিয়ে বালিতে গেঁথে দিয়ে গেলো পুরো সৈকতে । মশালের আলো এক অদ্ভুত আলোছায়ার মায়া  তৈরী করলো। আমরা সমুদ্রের তীরে বালিয়াড়িতে বসে বিয়ারের বোতলে চুমুক দিলাম । সাথে হালকা সি-ফুড সহযোগে ডিনারও সেরে ফেললাম এখানে ।

টনসয় ফেরিঘাটের কাছে বুকিং কাউন্টার থেকে পরেরদিনের একটা প্যাকেজ ট্যুর  কিনে নিলাম, স্পিড বোটে করে ফি ফি লে ও আসে পাশের দ্বীপগুলি ঘুরে দেখব বলে । হাতে সময় থাকলে অনেকে লং টেল বোটে চোরেও ঘুরে ন্যায় । ফি ফি লে দ্বীপটি  জনবসতিবিহীন ।  আছে পাহাড় ও তার আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা কিছু সুন্দর সমুদ্র সৈকত ও গুহা ।   পরেরদিন খুব সকাল সকাল আমরা জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। টনসয় ফেরিঘাট থেকে স্পিড বোট ছাড়ল।   আমরা ছাড়া আরো জনা দশেক বিদেশী ছিল বোটে । কিছুটা গিয়েই টনসয় বের  মুখের কাছে নোঙ্গর ফেলল । এখানে আমাদের হাতে স্নরকেলিং এর সরঞ্জাম দেওয়া হল। এখানে সমুদ্রের গভীরতা প্রায় দু-তিন তলা বাড়ীর সমান। আমরা নির্দেশ মতো লাইফ জ্যাকেট চড়িয়ে, চোখে ও নাকে জলনিরোধক মাস্ক  আর  প্লাস্টিকের নল লাগিয়ে নেমে পড়লাম সমুদ্রে সাদা সার্ক দেখতে। আমার সঙ্গী তিনজন  বোটে বসে ছিল । সাঁতার জানলেও এত  গভীর সমুদ্রে  সাঁতার কাটার  অভ্যিগতা নতুন, তাই প্রথমটা একটু ভয়ই করছিল।  আন্দামানে কোমড় জলে  স্নরকেলিং করার অভিজ্ঞতা আগেই ছিল তাই অসুবিধা হল না খুব একটা। কিছুক্ষন পর ধাতস্থ হওয়ায়  উপুড় হয়ে জলের মধ্যে চোখ ও মাথা ডুবিয়ে ভাসতে লাগলাম আর নলের সাহায্যে শ্বাস নিতে নিতে দেখলাম সমুদ্রের তলার এক অপূর্ব সৌন্দর্য্যে ভরা জগৎ। এখানে সমুদ্রের জল খুবই স্বচ্ছ থাকায় সূর্যের আলোতে  বেশ অনেকটাই গভীর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। হলুদ, সবুজ, নানা রঙের মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে খেলে বেড়াচ্ছে।  খুব কাছেও চলে আসছে কখনো সখনো।  ধরতে গেলেই পালিয়ে যাচ্ছে। সাদা সার্কও  দেখলাম এখানে। স্নরকেলিং শেষ করে বোটে উঠে এলাম। 

আমাদের পরের গন্তব্যস্থান ফি ফি লে দ্বীপ।  ক্রমশ কাছে আস্তে থাকল  দূর থেকে দেখা খাড়াই পাহাড়ে ভরা ফি ফি লে  দ্বীপটা।  পাহাড়ের সারি সমুদ্রের জল থেকে সোজা ওপরে উঠে গেছে। পাহাড়ের গা ঘেঁষে চললাম আমরা।  কিছুক্ষনের মধ্যে আমাদের বোট বাঁক নিয়ে  একটা খাঁড়ির মধ্যে  ঢুকে পড়ল।  চোখের সামনে হটাৎ ভেসে উঠলো অসম্ভব সুন্দর এক জায়গা ।  এই জায়গা টা  অনেকটা অর্ধচন্দ্রাকার। তিনদিকে উঁচু সবুজ পাহাড়ের কোলে ঘন সবুজ রঙের জল মিলেমিশে অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরো নৌকা ভাসছিলো। আমাদের সহযাত্রীরা অনেকেই তখন নেমে পড়েছে স্নরকেলিং করতে। আমিও ঝাঁপ দিলাম জলে।  বেশ কিছুক্ষন চিৎ সাঁতারে গা ভাসিয়ে দিলাম আকাশের দিকে  চেয়ে। তারপর স্নরকেলিং করে যা দেখলাম তা অতুলনীয়। মনে  হলো বুঝি কোনো বিশাল রঙিন টেলিভিশনে ডিসকভারি চ্যানেল দেখছি। এক আশ্চর্য সুন্দর রূপ। গোলাপি, হলুদ, কমলা, লাল কত সব রঙের প্রবালের জঙ্গল। আর তার ভেতর ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ ভেসে বেড়াচ্ছে। বেশ কিছুক্ষন জলে কাটিয়ে বোটে উঠে পড়লাম। লক্ষ্য করলাম বোট থেকে বেশ কিছুটা দূরে পাহাড়ের ধারে কিছু বড়  বড় পাথর এবং পাহাড়ের কোল  ঘেঁষে একটা দড়ির সিঁড়ি ফেলা । আমাদের পরের গন্তব্য ছিল  ফি ফি লের সব থেকে  অন্যতম জায়গা মায়া বে। এইখানে লিওনার্দো ক্যাপ্রিও অভিনীত হলিউড সিনেমা "The Beach" এর শুটিং হয়েছিল। আমরা হতাশ হলাম জেনে যে সমুদ্রের জল কম থাকায় সেখানে বোট যাবে না।   ওই দূরের দড়ির সিঁড়ি টি দেখিয়ে বোট চালক জানাল  যে যদি কেউ মায়া বে দেখতে একান্তই ইচ্ছুক থাকে তারা ওই দড়ি বেয়ে দ্বীপের ভেতর  দিয়ে মিনিট দশেকের রাস্তা পায়ে হেঁটে পার করে মায়া বে দেখে আস্তে পারে । অনেকেই যেতে রাজি হয়ে গেল।  আমিও উৎসাহিত হয়ে এডভেঞ্চারের নেশায় জলে ঝাঁপ দিলাম । বেশ কিছুটা সাঁতরে গিয়ে ওই বোট থেকে দেখা বড় বড়  পাথর গুলোর কাছে পৌঁছালাম। তারপর খুব সন্তর্পনে ধারালো সব পাথরের পাশ কাটিয়ে দড়ির সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম। উপরে উঠে যা দেখলাম তা অতুলনীয়।  দেখলাম নির্জন সুন্দর সাজানো একটা গ্রাম জঙ্গলের মধ্যে ।  দেখতে  দেখতে  এগোতে  লাগলাম। এটি আসলে "The Beach " সিনেমার সেট।  সেই জঙ্গল-গ্রামের শেষপ্রান্তে একখণ্ড রুপালি বেলাভূমি মায়া  বে। তিনদিকে উঁচু পাহাড় আর সামনে খোলা পান্না সবুজ সমুদ্র। বসে পড়লাম সৈকতে আর দু চোখ ভোরে চারিদিকের শোভা উপভোগ করতে লাগলাম।  বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই যে ভেতরে এইরকম একটা নৈসর্গিক স্থান আছে।  সমুদ্রের হালকা হালকা ঢেউ এসে আমায় ঘিরে ফেলছিল। আর তাতে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ খেলে বেড়াচ্ছিল। বেশ কিছুটা সময় এখানে কাটিয়ে আমি বাকিদের সাথে হেঁটে এবং তারপর সাঁতরে  ফিরে এলাম বোটে। 

আবার বোট ছাড়ল।  এবার গন্তব্যস্থল  মাংকি বে।  এটি ফি ফি লের পূর্ব দিকে ছোট একটি সমুদ্র সৈকত।  আমাদের স্পিড বোট কাছাকাছি পৌঁছে থামল ।  তারপর আমরা ছোট ছোট রবারের ভেলায় করে  পৌঁছালাম মাংকি বে  তে । সমুদ্র ও রুপালি বালি, সবুজ পাহাড় আর নীল আকাশ সব মিলিয়ে নৈস্বর্গিক জায়গা । এখানে প্রচুর  বাঁদরের দেখা মিলল, বুঝলাম দ্বীপের নাম সার্থক। যাত্রীদের কাছ থেকে খাবারের আসায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশ কিছুক্ষন কাটিয়ে আবার বোটে উঠলাম।  এবার ফি ফি ডনের টনসয় বে তে ফিরতে হবে । সময়ের মধ্যে ফিৱে এলাম। রিসোর্টে চেকআউট করে যখন ফেরিঘাট এ পৌঁছালাম তখন বেলা তিনটে। লঞ্চ ছাড়বে সাড়ে তিনটে।  লঞ্চ এগিয়ে চলল ক্র্যাবির দিকে।

ক্র্যাবি  ঘুরতে গাড়ি ভাড়া করতে হয়। ক্র্যাবি টাউন অঞ্চলে একাধিক ট্যুর অপারেটর আছে যাদের একজনের কাছ থেকে  সাইটসিয়িং প্যাকেজ বুক করে ঘুরে নিলাম দ্রষ্টব্য জায়গাগুলি । এখানে একধরণের যাত্রীবাহি গাড়ি চলে যাকে এরা টুক টুক বলে। গাড়িটির একপাশে মোটরসাইকেল ও আরেকদিকে লোকজনের বসার ব্যবস্থা। ব্যাঙ্ককে টুক টুক দেখলাম অনেকটা আমাদের দেশের অটো রিকশার মতো দেখতে। শুধু তুলনায় বেশ বড়। 

ক্রাবি থেকে আমরা বিকালের বিমানে ব্যাঙ্ককের ডন ম্যূয়াং এসে পৌঁছালাম। বিমানবন্দর থেকে শহরে যেতে ট্যাক্সি ভাড়া করা যায় ।  আমরা চারজন ছিলাম ও সাথে মালপত্র থাকায় আমাদের দুটো ট্যাক্সি নিতে হল।  রাস্তাঘাট ঝাঁ চক্ চকে ও দুই ধারে সব আকাশচুম্বী অট্টালিকা, বড় বড় হোটেল, আধুনিক শপিং মল ও দোকানপাট দেখে চোখ ধাঁদিয়ে যায় । মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে আছে অসংখ্য উড়ালপুল। প্রথম দেখায় এইসব দেখে অনেকের ব্যাঙ্কক কে একটি প্রাণহীন শহর বলে মনেহতে পারে।  একটু পড়লে জানা যাবে  এদেশের  প্রাচ্য এতিহ্যর কথা। ব্যাঙ্ককে দেবদূতের শহর বলা হয়। এই দেশের লোকজন অত্যন্ত ধর্মবিশ্বাসী।তাই শহরের প্রায় সব জায়গাতেই বৌদ্ধ মন্দির চোখে পরে।  ব্যাঙ্কক মধ্য থাইল্যান্ডের ছাও ফ্রায়া নদীর ধারে  অবস্থিথ। যারা প্রথমবার গেছেন ব্যাঙ্ককে তারা ঘুরে দেখে নিতে পারেন  বিগ বুদ্ধ মন্দির, গোল্ডেন বুদ্ধ মন্দির, প্রমূখ।  আর দেখে নেওয়া যায় ১৭৮২ সালে তৈরী রাজা রাম ১-এর আমলে তৈরী গ্র্যান্ড প্যালেস। অসামান্য স্থাপত্যশৈলীতে তৈরী এই প্যালেস যা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। এই প্রাসাদের বাইরের অংশেতেই বিখ্যাত এমারেল্ড বুদ্ধ মন্দির। কেউ চাইলে চাও ফ্রায়ার নদীর বুকে নৌকা বিহার করতে করতে থাই নাচ সহযোগে  নৈশাহার  সারতে পারে।

এর আগে আমি আরো দু-বার এসেছি থাইল্যান্ডে কিন্তু প্রত্যেক বার অবাক হয়েছি এদেশের  উন্নতি দেখে। শুধুমাত্র পর্যটনের ওপর ভর করে কীভাবে একটা দেশের অর্থনীতি চলতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না।  আমাদের ট্যাক্সি বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে এক্সপ্রেসওয়ে ধরল। গন্তব্য শুকুম্ভিত সয় -এর অ্যাম্বাসেডর হোটেল।  রাস্তায় যানজট থাকায় হোটেলে পৌঁছাতে ঘন্টা দেড়েক সময় লেগে গেল।  কয়েকদিন শান্ত নিরিবিলি জায়গায় কাটিয়ে হটাৎ করে ব্যাঙ্ককের  আলোর  রোশনাই , কোলাহল ও কংক্রিটের জঙ্গলের মাঝে পড়ে একটু কাহিল হয়ে পড়েছিলাম সকলে। ঠিক করলাম আজ আর  কোথাও যাবো না। আগে বেশ কয়েকবার ব্যাঙ্কক এসেছি বলে এবার ঠিক করেছিলাম যে শুধু গুটি কয়েক জায়গাতেই যাব। রাতে একটা বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয়  খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম।

পরেরদিন শনিবার থাকায় ঠিক করলাম আমরা সারাদিন ছাতুচক বাজারে  কাটাবো। গতবারে বড় আফসোস হয়েছিল হাতে সময়  কম পাওয়ার জন্য । বিশ্বের বৃহৎকার বাজার গুলির মধ্যে এটি একটি। ২৭ একর জমির উপর ১৫০০০ দোকানপাট  নিয়ে এই সপ্তাহান্তের হাট ছাতুচক। থাইল্যান্ডের বিভিন্য  প্রান্ত থেকে লোক আসে  বেচা-কেনা করতে। থাই এবং বিদেশী উভয় দের  জন্যই  এই  বাজার  অতি জনপ্রিয়। এখানে বলতে গেলে সবকিছুই পাওয়া যায়। এন্টিক থেকে শুরু করে সেরামিক্স,  মাটি, কাঠ, ফুল, ফল, গাছ, জামাকাপড়, স্থানীয় স্যুভেনির কি নেই।  বাস, ট্যাক্সি, আন্ডার-গ্রাউন্ড ট্রেন, স্কাই ট্রেন সবই যায় সেখানে।। তবে আমরা "নানা" স্টেশন থেকে  স্কাই ট্রেনে চেপে  শহর দেখতে দেখতে  "মোচিৎ " পৌঁছালাম সকাল ৭ টার  ভেতর। এই স্টেশন থেকে হাঁটা পথে ছাতুচক বাজার। জলখাবার এখানেই সেরে শপিং করতে শুরু করে দিলাম । কি ছেড়ে কি নেব ভেবে পাচ্ছিলাম না।  তবে এখানে পৌঁছেই  ১ নম্বর স্টল থেকে দুটো বাজারের মানচিত্র সংগ্রহ করে নিলাম, যা আমাদের খুব সাহায্য করল ঘুরে ঘুরে কেনাকাটি করতে । প্রচুর কেনাকাটা সেরে  ট্যাক্সি চড়ে  ফিরে এলাম হোটেলে ।  পরেরদিন রবিবার তাই  ঠিক করলাম আবার যাব ছাতুচক বাজারে । 

এবারে কলকাতা থেকে আসার আগেই ঠিক করে-রেখেছিলাম যে "সিয়াম নিরামিত ব্যাঙ্কক" নামে অনুষ্ঠানটা দেখে ফিরব।   হোটেলের ট্রাভেল ডেস্ক, গাড়ি থেকে টিকিট সমস্ত ব্যবস্থা  করে দিল সেই সন্ধেবেলা।   এটা বিশ্ব বিখ্যাত অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে একটি, যা গিনিস  বুকেও  স্থান করে নিয়েছে । হোটেল থেকে  আমাদের নিতে গাড়ি এলো ঠিক ৫.৫০ নাগাদ। বড় দল থাকলে প্রাইভেট বাসেও যাওয়া যায়, তাতে  খরচটা একটু কম পরে।  আমাদের মাথাপিছু ১৮০০ ভাট দিতে হলো।  এতে যাতায়াত, টিকিট  ছাড়াও খাবারের খরচ ধরা ছিল ।    আমরা ঘন্টা খানেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম রতছাদা নামে  সিয়াম নির্মিত থিয়েটার প্রাঙ্গনে । দেখলাম বহু গাড়ি ও বাস এসেছে।  আমাদের ড্রাইভার আমাদের জানালো যে সে আমাদের হোটেলে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার  জন্য এখানে  গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করবে শো শেষ হওয়া অব্দি।  প্রধান গেট দিয়ে ঢোকার মুখেই একটি সুন্দরি মহিলা হাত জোর করে নমস্কার জানাল। পরনে সুন্দর রেশমি পোশাক ও মাথায় মুকুট, বেশ দেখতে লাগছিল।  আমরাও প্রতি নমস্কার জানাতেই সে জানতে চাইলো যে আমরা তার সাথে ছবি তুলতে ইচ্ছুক কিনা। আমরা রাজি হতে ফটোগ্রাফার ছবি তুলল। বুঝলাম ট্যুরিজম ব্যবসা কত উন্নত এদেশে। এই ছবিগুলো অনুষ্ঠানের শেষে বিক্রি হয় ।  আমরাও কিনলাম! ফটক দিয়ে ঢুকেই সামনে বিশাল  বড় উঠোন।নজর পড়ল দুটো হাতির দিকে। কেউ চাইলে হাতির পিঠে এক পাক ঘুরেও নিতে পারে। আমরা চলে গেলাম ডিনার সারতে কারন ৮ টায় শো আরম্ভ।  খাবারের এলাহি ব্যবস্থা ছিল।  তারাতারি খেয়ে প্রেক্ষাগৃহে এসে ঢুকলাম। তার আগে অবশ্য ওই উঠানেই একটা ছোট অনুষ্ঠান দেখে নিলাম। আমেজটা তৈরি হয়ে গেল । বিশাল হল ঘর।  আমাদের আসন স্টেজের খুব কাছেই পড়েছিল।  বিশ্বের বৃহত্তম স্টেজ প্রযোজনা মধ্যে এটি একটি ।  কি সুন্দর পোশাক আশাক, কি   উন্নত মানের সেট ও কারিকুরি যা দেখে আমাদের তাক লেগে গেল। এই শো এর মাধ্যমে অতি সুন্দর ভাবে থাইল্যান্ডের ইতিহাস ও সংস্কৃতি  পরিস্থাপনা করলো প্রায় ১০০ জন অংশগ্রহণকারী। মুগ্ধ হয়ে হোটেলে ফিরলাম।

পরেরদিন ভোর পাঁচটা  নাগাদ আমরা রওনা হলাম  ভাসমান বাজার  দেখতে যাব বলে। গাড়ি আগে থাকতেই বলা ছিল। থাইল্যান্ডের ভাসমান বাজারের   মধ্যে সব চাইতে বিখ্যাত দমনএন সাদুয়াক। প্রচুর পর্যটকের ভীড় ও হয় এখানে। রাস্তা মসৃন হওয়ায় আমরা ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম। রাস্তায় জলখাবার সেরে নিলাম একটি সুন্দর এলিফ্যান্ট পার্কে।  এখানে দাঁতাল  হাতির দাঁতে  ছেপে ছবিও তুললাম। এখান থেকে রওনা দিয়ে  কিছুক্ষনের মধ্যে গাড়ি এসে দাঁড়াল একটি খালের পারে। বোঝার উপায় নেই কোথায় এলাম, চারিদিকে শুধু আম, কাঁঠাল, কলার জঙ্গল। খালের ধারে  আমাদের জন্য একটি মোটর চালিত নৌকা  অপেক্ষা করছিল। তাতে উঠতেই আমাদের ছবি ক্যামেরা বন্দি করে রাখল একটি মেয়ে। বুঝলাম এটাও একধরণের ব্যবসা। এই ছবিটি একটি সুন্দর কাঁচের প্লেটে সাঁটকানো অবস্থায় কিনলাম ফেরার সময়।  নৌকর  একদম সামনে বসলাম ক্যামেরা হাতে আমি ও আমার পেছনে পর পর একেক করে তিনজন । একদম শেষে হাল ধোরে আমাদের মাঝি। এ খাল সে খাল দিয়ে  ঢেউ তুলে ছুটে চলল আমাদের নৌকা।  কিছুক্ষন পরে নজরে এল খালের দুই ধারে দোকান পাটের দিকে। পসরা সাজিয়ে বসে আছে দোকানিরা, অধিকাংশই মহিলা। নৌকার  গতিও কমতে থাকল এই সব দোকান পাটের সামনে গিয়ে। নজরে এল খালের ধারে "কোবরা শোএর " বোর্ডের দিকে। এখানে খাল বেশ চওড়া ও আশেপাশে ছোট বড় নৌকায় পর্যটক ঠাসা। দেখলাম ছোট ছোট ডিঙি নৌকার ধাঁচে নৌকাতে চড়ে কেউ ডাব, ফল, মিষ্টি, ও নানা রকমের খাবারদাবার বিক্রি করছে,  কেউ জামা কাপড়, স্যুভেনির বিক্রি করছে ।  ঠিক যেন একটি সুন্দর সাজানো গছানো রঙিন ছবি। আমরাও আমাদের  নৌকাতে করে  এদের পাশ কাটিয়ে ধীর গতিতে এগোতে থাকলাম। টুকটাক ফল কিনেও খেলাম, তবে বেশ চড়া দাম সব জিনিসের। দেখলাম এই ভাসমান বাজারের ধারে  বহু লোকের  বসবাস । আমরা খালের ধারে একটি মোনাস্ট্রিও ঘুরে  নিলাম। সময় শেষ হতে  ফিরে এলাম আমাদের গাড়ি যেখানে ছেড়েছিল সেইস্থানে । দুপুরের মধ্যে ব্যাঙ্ককে ফিরে এলাম।  সন্ধেবেলা টুক টুকে চেপে পাতং ও চাইনা টাউন দেখে নিলাম। 

পরেরদিন গাড়ি ভাড়া করে চিড়িয়াখানা ও সাফারি দেখে এলাম। টিকিটের মধ্যে দুপুরের খাবারের টাকা ধরা ছিল। এখানে পৌঁছাতেই আমাদের গাড়ির চালক আমাদের হাতে একটি পার্কের মানচিত্র ধরিয়ে দিল।  আমরা গাড়ি করেই সাফারি তে ঢুকে পরলাম। অনেকটা আফ্রিকার গেম ফরেস্টের ক্ষুদ্র সংস্করণ। গাড়ি খুব ধীর গতিতে এগোতে লাগল। গাড়িথেকে নামা মানা। আমি সামনের আসনে বসে ছিলাম ক্যামেরা হাতে। চমকে উঠলাম যখন দুটো উঁট এগিয়ে এসে মুখ বাড়িয়ে কাঁচের উপর কি যেন দেখতে লাগল। একে একে পেলিক্যান্, জিরাফ, গন্ডার, হরিনের দেখা মিলল। আর দেখলাম গোটা পনেরো বিরাট বিরাট রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বেশ ভয় করছিল এক সাথে খোলা জায়গায় এতগুলো বাঘ দেখে। গাড়ির ভেতর বসেও হাড় হিম হয়ে যাচ্ছিল। সাফারি থেকে বেরিয়ে আমরা পায়ে হেঁটে চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখলাম। বাঘের বাচ্ছাকে কোলে নিয়ে ছবিও তুললাম এখানে।

রাতের বিমানে করে ভোর রাতে ফিরলাম কলকাতায়। খুব আনন্দ করে কাটল কয়েকটা দিন। 


কিভাবে যাবেন:
কলকাতা থেকে সরাসরি বিমানে ব্যাঙ্কক পৌঁছানো যায়। আগে থাকতে টিকিট কাটলে যাতায়াত অনেক  পড়বে। 

কোথায় থাকবেন:
ব্যাঙ্কক -
গোল্ডেন প্যালেস হোটেল - +৬৬ ০২ ২৫২ ৫১১৫, www.goldenpalacehotel.com
হোটেল অ্যাম্বাসেডর - +৬৬ ০২ ২৫৪ ০৪৪৪, www.ambassador.bangkokshotels.com

ক্র্যাবি -
বিয়ন্ড ক্র্যাবি রিসোর্ট - +৬৬ ৭৫ ৬২৮ ৩০০, www.beyondresort.com
ক্র্যাবি রিসোর্ট - +৬৬ ৭৫ ৬৩৭ ০৩০, www.krabiresort.com 

ফি ফি -
ব্যানিয়ান ভিলা  -  + ৬৬ ২ ৯৩৮ ৯৪৬১, www.ppbanyanvilla.com 
কখন যাবেন - 
ক্র্যাবি ও ফি ফি বেড়াবার সেরা সময় নভেম্বর থেকে মার্চ।

টিপস -
ব্যাংকক বিমানবন্দরে বিদেশী পর্যটকদের জন্য অন আরাইভাল ভিসার ব্যবস্থা আছে। 
থাইল্যান্ডের মুদ্রার নাম বাট।  
সুতির জামা কাপড়, সুইমিং কস্টিউম, ইলেকট্রনিক জিনিস কেনার আদর্শ জায়গা। 
সানস্ক্রিন লোশন, রোদ চশমা, হালকা সুতির জামা, টুপি , পা খোলা চটি আবশ্যক। 

Simla - Sarahan -Sangla - Chitkool - Kalpa - Dalash - Jalori Pass - Kullu - Manali


হিমাচল প্রদেশ রাজ্যটি আয়তনে ছোট হলেও এখানে দেখার স্থান এত বেশি যে  একবারের ছুটিতে পুরোটা বেড়ানো খুবই কঠিন। আর আমার মতো ছবি তোলার নেশা থাকলে তো আরও কঠিন । এবারে দূর্গা পূজোর ছুটি লম্বা থাকায় আমি, আমার হাজব্যান্ড ও এক বন্ধু বেরিয়ে পড়লাম সিমলার উত্তর-পূর্ব  দিকে কিন্নর-কৈলাস ও  লাহুল-স্পিতি বেড়াতে ।  হিমাচলে দশেরা উৎসব খুব বড় করে পালন করা হয়, তাই হোটেল ও গাড়ি পাওয়া মুশকিল হবে বলে আমরা কলকাতার  থেকেই   বুক করে নিয়েছিলাম। আমরা একদিন আগে হিমাচল প্রদেশের রাজধানী সিমলায় পৌঁছালাম। পরেরদিন  সকাল সকাল আমাদের চালক রাজেন্দার সিংহের (রাজু ভাই) সাথে বেরিয়ে  পড়লাম ২২ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে রামপুর হয়ে সারহান পথে ।  সিমলা থেকে  সারহানের দুরত্ব ১৭২ কিমি। HPTDC র  প্রচুর বাস চলে এই রাস্তায়।  তবে এই পথে গাড়ি নেওয়াটাই সুবিধের।  আমরা কুফরী ও তারপর নারকান্ডা   হয়ে এগিয়ে চললাম। পথে সুন্দর সুন্দর গ্রাম পড়লো।  নজরে পড়ল ধাপচাষের সৌন্দর্য্য । পথে বহুবার গাড়ি থেকে নেমেছি চোখের খিদে মেটাতে ও  অপূর্ব সব  দৃশ্য ক্যামেরা বন্দী করতে  । অনেকে নারকান্ডাতে  হাটু মাতার মন্দির দর্শন করে আসেন হাটু পিকে চড়ে। পথে শতদ্রু নদীর দেখা মিলল রামপুরের বেশ কিছু আগে কিঙ্গল বলে এক স্থানে  । বুশাহার  রাজাদের প্রাচীন রাজধানী রামপুরে পৌঁছাতে আমাদের দুপুর  একটা বেজে গেল।  সিমলা থেকে দুরত্ব ১৩৫ কিমি। রামপুর কে  বলা হয় কিন্নর রাজ্যের প্রবেশদার। শতদ্রু বয়ে চলেছে শহরের একদম পাস ঘেঁসে। রামপুর খুব ব্যস্ত জায়গা, একসময় হিমাচলের প্রাচীন বানিজ্যকেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি  ছিল।   আমরা রামপুর রাজপ্রাসাদের খুব কাছে বাজারে একটা দোতালা  রেস্তোঁরায়  দুপুরের খাবার সারলাম। এইখান থেকে লক্ষ্য করছিলাম  নিচে প্রচুর স্থানীয় লোক অপেক্ষা করছে বাসের জন্য। এখানে প্রত্যেকটি কিন্নরী মহিলা মাথায় একধরনের রুমাল পিছমোড় করে বাঁধে  ।  পরে জানলাম যে  এই রুমাল কে ওরা "ধাট্টু" বলে। আর কিন্নরী ছেলেরা মাথায় সবুজ রঙের গোল টুপি পরে।  খাবার পর আমরা রামপুরের ১৯ শতকে তৈরী পদম প্যালেসের সামনে গেলাম। বাইরে থেকেই দেখতে হবে।  প্রাসাদের দোতালাটি কাঠের তৈরি ।

রামপুর থেকে রওনা হয়ে ২৩কিমি যাবার পর জিওরি তে জাতীয় সড়ক ছেড়ে ডান দিকে চড়াই  পথ ধরলাম।  গাড়ি  পাহাড়ের নিস্তবদ্ধতা ভেদ করে উঠতে থাকলো সংকীর্ন আঁকা বাঁকা রাস্তাদিয়ে ।  নির্জন সুন্দর একটা গ্রাম সারাহান একসময় বুশাহর রাজাদের রাজ্যপাট ছিল। সারাহানের অবস্থান ৭১০০ ফিট  উচ্চতায়। শীতে প্রবল তুষারপাত হয় এখানে। সারাহানের প্রাচীন নাম শোনিতপুর। এখানে প্রধান দ্রষ্টব্য স্থান ২১৬৫ মিটার ভীমাকালী মন্দির। এটি ৫১ পীঠের একটি। এখানে সতীর কান পড়েছিল। আমাদের থাকার ব্যাবস্থা ছিল  মন্দির সংলগ্ন একটি হোটেলে।  সেদিন মহাসপ্তমী, মন্দিরে পুজো দেবো বলে আমরা বিকাল বিকাল হোটেলে  পৌঁছে স্নান সেরে নিই  । বেশ ঠান্ডা ছিল। মন্দিরটির আকার অনেকটা প্যাগোডার মত ।  মন্দিরের গায়ে কাঠ ও পাথরের অপূর্ব কারুকাজ করা। দোতালায়  রয়েছে দেবী পার্বতীর গর্ভমন্দির।  আমরা এখানে পূজা দিলাম।  তৃতীয় বা সর্বোচ্চ তলায় বুশাহর রাজাদের কুলদেবতা ভীমাকালী।  মন্দিরচত্তরে অন্যান্য দেবদেবীর মন্দিরও রয়েছে। চামড়ার জিনিসপত্র নিয়ে মন্দিরে ঢোকা নিষেধ । মাথায় টুপি বা কাপড় চাপা দিয়ে ঢুকতে  হয় মন্দিরে।  দশেরায় এখানে বড় উৎসব হয়। মন্দিরের চাতালে দাঁড়িয়ে এক ভদ্রলোক আমাদের বরফে ঢাকা ৫২২৭ মিটার উচ্চতার শ্রীখন্ডমহাদেব পর্বতের চূড়া দেখালেন। আর দেখালেন আসল মন্দিরের পাশে সেই স্থান যেখানে সতীর কান পড়েছিল।   ওখানে যাওয়া মানা। আমরা বেশ কিচুক্ষন মন্দিরচত্তরে  বসে থাকলাম । সে এক অদ্ভূত অনুভূতি।  পরেরদিন খুব ভোরে উঠে গরম জামাকাপড় চাপিয়ে ক্যামেরা কাঁধে বেরিয়ে পরলাম পায়ে হেঁটে চড়াই পথে আধ কিমি দূরে পক্ষিরালয় দেখব বলে । এখানে নানা জাতের পাহাড়ি পাখি  রয়েছে। শুধু পাখি দেখাই  নয় , এই জায়গা থেকে শ্রীখন্ড, গিসু-পিসু ইত্যাদি তুষারশৃঙ্গের  দারুন  দৃশ্য দেখা যায়,  আর তারসাথে দেখা যায় ভীমাকালী  সহ গোটা উপত্যকার অসাধারন দৃশ্য। বুশাহার রাজাদের রাজপ্রাসাদ আছে এই স্থানে। প্রবেশ নিষেধ।   এখানে এক স্থানীয় কিন্নরী মহিলার ছবি তুললাম নানান  ভঙ্গিমায় । খুশি  হয়ে সে আমার আবদার রাখলো। পরিবর্তে  সে আমার সাথে তার একটা সেল্ফি নিতে  বললো  । ভালো লাগলো দেখে যে এরা কত অল্পতে খুশি  । ফিরে এসে দেখি আমার সঙ্গী দুজন তৈরি হয়ে আমার জন্য অপেক্ষা  করছে।  স্নান সেরে তারাতাড়ি  তৈরী হয়ে নিলাম মহাঅষ্টমীর  দিনে  ভীমাকালী মন্দিরে আর একবার প্রনাম সেরে রওনা হব ফের জিওরি হয়ে পূবে  সাংলার পথে।

সিমলার থেকে সাংলার দুরত্ব ২২৬ কিমি, আর সারাহান থেকে সাংলার  দুরত্ব ৯৪ কিমি।  জিওরি থেকে আরো ৬ কিমি পূবে যাবার পর আমরা প্রকৃত কিন্নর জেলায় প্রবেশ করলাম। সেখান থেকে ওয়াংটু, টাপরি পেরিয়ে কারছাম পয়েন্টে  এসে ২২  নম্বর জাতীয় সড়ক ছেড়ে আমরা  শতদ্রুর  ওপর ব্রিজ  পেরিয়ে ডানদিকের চড়াই রাস্তা ধরলাম সাংলা যাবার জন্য। এই কারছাম  পয়েন্টে শতদ্রু আর বাসপা নদীর সঙ্গম। এখান থেকে সাংলার দুরত্ব ১৮ কিমি। এই দিকের রাস্তা যেমন ভয়ংকর দুর্গম তেমনি নৈসর্গিক।  আমাদের গাড়ির চালকের হাত যে এত পাকা তা এই রাস্তায় না এলে বোঝা যেত না।  এখানে রাস্তা খুব সরু ও খারাপ তাই ধীর গতিতে চলছে গাড়ি।  খুবই ধসপ্রবন এলাকা। বামদিকে রুক্ষ খাড়া পাহাড় আর ডানদিকে অতল খাদ, নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে  তুঁতেরঙা বাসপা নদী। নিচের দিকে চোখ গেলেই  হৃদয়-স্পন্দন থেমে যাওয়ার অবস্থা।   খাদের অপর পারেও রুক্ষ উঁচু পাহাড় আর পাহাড়ের ফাঁক-ফোকরে গুটি কয়েক  বাড়ি ঘর দেখতে পেলাম। জানিনা কি করে যাওয়া আসা করে  ওখানে থাকা মানুষজন । আমি ফটো তুলব বলে গাড়ি দাঁড় করালাম।  এখানে এত  জোরে হওয়া দিচ্ছিল যে শক্ত করে ক্যামেরা ধরে রাখাও মুশকিল হচ্ছিল আমার, তাই তারাতাড়ি উঠে পরলাম গাড়িতে ।

সম্বিত ফিরল যখন আকস্মিক চড়াই পাহাড় থেকে নেমে আমরা খোলা চওড়া  দেওদার, পাইনে ঘেরা সমতলে পৌঁছালাম । বুঝলাম সাংলার  উপত্যকায় পৌঁছেগেছি। চারিপাশ সবুজে মোড়া , বরফ ঢাকা পাহাড়ের সারি  যা ভারতবর্ষকে আলাদা করেছে  তিব্বত থেকে। বাসপা  নদী বয়ে চলেছে সাংলা উপত্যকার ওপর দিয়ে। ২৬৮০ মিটার উচ্চতার এই নয়নাভিরাম সাংলা  উপত্যকা জুড়ে রয়েছে আপেলের  বাগান।  এখানের আপেলের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। এছাড়াও সাংলায় আখরোট, চিলগোজা, নাসপাতি ফলের গাছও রয়েছে। এই  উপত্যকায় ধাপচাষের সৌন্দর্য্য  দেখার মতো। সাংলা  উপত্যকা এক কথায় অসাধারণ।

আমরা যে হোটেলে উঠলাম তার বাগানেও অনেক প্রজাতির আপেল ফলে আছে - লাল, কালচে লাল, সোনালি, হলুদ ও সবুজ রঙের। দোতলায় সুবিশাল  একটি তিন শয্যার ঘর  দিল আমাদের । দুপুরের আহারের পর আমরা ঘর সংলগ্ন ঝোলাবারান্দায় এসে দাঁড়াতেই চোখ জুড়িয়ে গেল সামনে বরফে ঢাকা নাম না জানা পর্বতমালার দিকে তাকিয়ে। আমার হাজব্যান্ড আর্টিস্ট, এই দৃশ্য দেখে  ও ছবি আঁকতে বসে পড়ল । বিকালে কিছুটা সময় কাটালাম সাংলার বাজারে। ফটো তুললাম লোকজনের। এখান থেকে অনেকে ঘুরে আসেন কামরু দুর্গ। কামাখ্যা মাতার মূর্তি আছে এই পাঁচতলা দুর্গে।  গাড়ির রাস্তা থেকে ১ কিমি পথ উঠে গেছে দুর্গ পর্যন্ত ।  ফিরে আসতে হোটেল ও বাগানের মালিক বয়স্ক ভদ্রলোক আমাদের বাগান ঘুরিয়ে দেখালেন । চোখে পড়ল স্তুপাকৃত করা আপেল।  ওনার মুখে শুনলাম এবার পুরো বাগান টাকার বিনিময় লীজে দিয়েছেন  । বাগানের মধ্যেই চলেছে আপেল ঝাড়ামোছা করে চকচক্  করে বাক্সে  ভোরে দেশ বিদেশে পাঠানোর কাজ। ভদ্রলোক আমাদের বাগান থেকে তুলে জাফরান সমেত ফুল উপহার দিলেন। বাগান যেখানে শেষ হয়েছে ঠিক সেখান থেকে খাড়া উঠে আছে কিন্নর-কৈলাস  শৃঙ্গ ।  ঘাড় তুলে আপেল গাছের উপরে তাকালে উঁকি মারে তুষারশৃঙ্গ। বেশ শীত করছিল তাই ঘরে ঢুকে পড়লাম । ঠিক হলো পরেরদিন ছিটকুল হয়ে আমরা যাব কল্পা তে।

সাংলার উত্তরে ২৬ কিমি দূরত্ব  ছিটকুল গ্রাম (উচ্চতা ৩৪৬০ মিটার)। সকাল সকাল বেরিয়ে আমাদের রকছম হয়ে  ছিটকুল পৌঁছাতে সময় লাগলো ঘন্টাখানেক। যাত্রাপথটা  অসম্ভব  সুন্দর। তুঁতেরঙা  বাসপা নদী বয়ে চলেছে উপত্যকার  বুক চিরে। নদীর দুধারে নানা রঙের খেত। রকছম -এ  পৌঁছে বাসপা নদী কে হাতের নাগালে পেয়ে গেলাম। আমরা এখানে নদীর ধারে একটি কাঠের তৈরি রেস্তোঁরায় চা খেলাম। জানলা দিয়ে চোখ পড়ল নদীর উপর কাঠের সেতুর দিকে । ঠিক যেন হাতে আঁকা  ছবি।  এক ঝাঁক পায়েরা সবুজ পাহাড়ের কোল ঘেঁসে উড়ে গেল চোখের সামনে দিয়ে।  ধীরে ধীরে চড়াই রাস্তা ধরে এগিয়ে একসময় পৌঁছে গেলাম চীন (তিব্বত) সীমান্তের দিকে ভারতের শেষ গ্রাম ছিটকুলে।  ছবির মত গ্রাম ছিটকুল। এখান  থেকে চীন সীমান্তের দূরত্ব ৩০ কিমি।  পুরো জায়গাটা উঁচু পাহাড়ে ঘেরা বাদামিরঙ্গা।   শীতে বরফ পড়ার কারণে পুরো ছিটকুলই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় কিন্নরের অন্যান্য অঞ্চলের থেকে । এখানে চিত্রলেখামাতার মন্দির ও শিবমন্দির আছে।  আমরা গাড়ি থেকে নেমে ধীর গতিতে ঢালু  পথ ধরে নদীর ধারে পৌঁছালাম। তিরৄতিরৄ  করে বয়ে চলেছে সেই তুঁতেরঙা বাসপা নদী।  নদীর দুধারে অসংখ ছোটবড় পাথর ও উঁচু তুষারশৃঙ্গ  মিলে এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে এই  স্থানের । ঠান্ডা বরফ গলা নদীর জল স্পর্শ করলাম। হটাৎ তুষারবৃষ্টি সুরু হওয়াতে  তাড়াতাড়ি    চড়াই ভেঙ্গে  গাড়ির কাছে ফিরতে বেশ বেগ পেতে হলো। চা পান করে আমরা ফেরার পথে রওনা হলাম। মনে হলো এক রাত্রি এখানে  থাকলে বেশ ভাল হত। ছিটকুলে  থাকার জন্য  আছে যাযাবর ক্যাম্প।  সাংলায় দুপুরের আহার সেরে নিয়ে কল্পা রওনা দিলাম ।

সাংলার থেকে কল্পার  দূরত্ব ৫০ কিমি।  উচ্চতা ২৯৬০ মিটার। আমরা এবার  কারছাম পয়েন্টে  এসে শতদ্রু র  ওপর ব্রিজ  পেরিয়ে ডানদিকের ২২  নম্বর জাতীয় সড়ক ধরলাম। পুয়ারি থেকে জাতীয় সড়ক ছেড়ে বাঁহাতি চড়াই রাস্তা যেটা উঠে গেছে, সেই রাস্তা ধরে রেকং পিও ছাড়িয়ে  কল্পা পৌঁছালাম।  রেকং পিও হছে কিন্নর জেলার সদর শহর। স্কুল,হাসপাতাল, হোটেল, ব্যাঙ্ক নিয়ে এটি একটি জমজমাট পাহাড়ি শহর।  রেকং পিও থেকে কল্পার দূরত্ব ১৩ কিমি। যত আমরা উপরে উঠতে লাগলাম পাইন , দেওদার গাছের মাঝ দিয়ে তত মনে হলো এই বুঝি হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করতে পারব ৬০৫০ মিটার উচ্চতার কিন্নর-কৈলাস কে। কিন্নর- কৈলাসের  কোলের কাছে কল্পা যেন এক শান্তির নীর। অতীতে এর নাম ছিল - চিনি। আমাদের হোটেলের  অবস্থান  একটি অতি সুন্দর জায়গায়, এখান  থেকে খুব কাছে দেখা যায় কিন্নর-কৈলাস সহ হিমালয়ের অন্যান্য হিমশৃঙ্গসারি ।  আমরা একটি কটেজে উঠলাম। কিন্নর-কৈলাস শৃঙ্গের খুব কাছ ঘেঁষে  ৭৯ ফুট উঁচু শিবলিঙ্গের মত দেখতে এক পাথর। প্রাচীনকালে শিবভক্ত বানাসুর নাকি এটির প্রতিষ্ঠাতা। এই পাথরটির রঙ পরিবর্তন করে দিনের বিভিন্ন  সময়।  তবে আমি শুধু  কালো আর সাদা হতে দেখেছি আর তার ছবিও তুলেছি । অনেকে পায়ে হেঁটে অগাস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ৭-৮ দিনে দুর্গম কিন্নর-কৈলাস পরিক্রমা করে । পুরো কল্পা, আপেল বাগানে ভর্তি। কল্পার গোল্ডেন আপেলের খুব খ্যাতি সারা বিশ্বে ।

আমাদের প্ল্যান ছিল পরেরদিন কল্পাতে ঘুরে লাহুল-স্পিতি যাওয়ার ।  সেখানে বিভিন্ন জায়গায় তিন রাত কাটিয়ে  কুন্জুম  ও রোটাং পাস দিয়ে মানালিতে প্রবেশ করার । সেইমত আমাদের ফ্লাইটে টিকিট  কাটা ছিল ভুন্টার (কুলুর বিমানবন্দর) থেকে। কিন্তু প্রকৃতি বিরূপ হলো।  রাতে খবর এলো কুন্জুম পাস বন্ধ হয়ে গেছে বরফ পরে। শুনলাম প্রতি বছর অক্টোবর মাসের  মাঝামাঝি সময় Govt . থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয় কুন্জুম পাস।  কিছু স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সী পারাপার করে থাকে কখনো সখনো। অগত্যা ঝুঁকি না নিয়ে সেই রাতে নতুন প্ল্যান করে ফেললাম । ঠিক করলাম পরেরদিন আমরা রামপুরে রাত কাটিয়ে প্রচলিত পথ ছেড়ে জালোরি পাস হয়ে কুলু তে  যাব । খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল।  গরম জামাকাপড় চাপিয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি সবে ভোরের আলো ফুটছে আর তার মিষ্টি কমলা রঙ লেগেছে তুষারশৃঙ্গের গায়ে।  অভিভূত হয়ে তাকিয়ে রইলাম এই নৈসর্গিক দৃশ্য-র দিকে। ক্যামেরা বন্দী করলাম বেশ কিছু ছবি।

যে পথে এসেছি সে পথ দিয়ে ফেরার আগে কল্পার কিছু দ্রষ্টব্য স্থান দেখে নেব বলে তৈরী হয়ে নিলাম তাড়াতাড়ি । দেখে নিলাম লোচাবা লাখাং নামে বৌদ্ধ গুম্ফাটি ও তারই পাশে দারুন স্থাপত্যের নারায়ন-নাগিনী মন্দিরটি ।  হাড়হিম করা সুইসাইড পয়েন্ট দেখে গেলাম হেরিটেজ গ্রাম রঘিতে  । আমরা রেকং পিও  হয়ে পুয়ারি থেকে ২২ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে চেনা পথ ধরলাম । রামপুরের খুব কাছে ডালাস নামে একটি জায়গায় সড়কের ধারে একটি ছোট হোটেলে উঠলাম। সারা পথের সঙ্গী ছিল শতদ্রু  নদী। এই হোটেলের ঠিক সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে শতদ্রু।

খুব সকালে রওনা দিলাম জালোরি পাস,  সোজা গ্রাম হয়ে  কুলু-মানালির  দিকে। এই  পথটি অতি নির্জন এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে  ভরা। পথে ধাট্টু কিনে মাথায় বাঁধলাম।  পথের ধারে কাঠের কারুকাজ করা প্রচুর বাড়ি দেখতে পেলাম  ।  পৌঁছেগেলাম ৩২২৩ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত জালোরি পাসে সকাল সকাল । ডালাস থেকে জালোরি পাস ১০০ কিমি দুরে। পাসের ওপর জালোরি মাতার মন্দির। কনকনে ঠান্ডা হওয়ার দাপট উপেক্ষা করে গাড়ি থেকে নেমে ক্যামেরা বন্দী করলাম তুষারশোভিত সারিবদ্ধ গিরির অপূর্ব দৃশ্য। এখান থেকে দেখা যায় পিরপাঞ্জল, শ্রীখন্ড, কিন্নর-কৈলাস , ধৌলাধার , প্রভৃতি  তুষারশৃঙ্গ। ডিসেম্বরের শেষ থেকে মার্চ মাস অবধি তুষারপাতের কারণে জালোরি পাস বন্ধ থাকে। এখানে আলাপ হল সদ্য বিবাহিত  কিন্নরী দম্পতি ও তাদের পরিবারের সাথে।  কিন্নরী পোশাক ও গয়না গায়ে চলেছে শ্বশুর বাড়ি কাজাতে ।   আমরা এরপর ৫ কিমি দূরের উতরাই  রাস্তা ধরে ২৬৮৩ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত সোজা গ্রামে  তির্থন নদীকে  পাশে পেলাম। এই গ্রামটিও খুব সুন্দর । রাস্তা অতন্ত্য খারাপ থাকায় খুব ধীর গতিতে চলছিল গাড়ি। এরপর বানজার, অট হয়ে ভুন্টার পৌঁছালাম দুপুর দেড়টায়। তিন কিমি দৈর্ঘের অট টানেল পার হতেই বিপাশা নদীর দর্শন মিলল। এই নদীর ধারে এক পাঞ্জাবী ধাবায় দুপুরের আহার সারলাম। কুলুতে হোটেল না পাওয়ায় ভুন্টারে এক হোটেলে উঠলাম আমরা । জালরি পাস থেকে ভুন্টারের  দূরত্ব ৬৭ কিমি।

বিকালে আমরা কুলু গেলাম দশেরার মেলা দেখতে। ভুন্টার থেকে ১০ কিমি দূরে ১২১৯ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত কুলু উপত্যকা।  কুলু উপত্যকার অবস্থান বিপাশা নদীর ধারে। কুলুর ঢালপুর ময়দানে এই মেলা বসে । হিমাচলের বিভিন্ন প্রান্তের দেবতাদের ডুলি করে নিয়ে আসা হয় এখানে ।   প্রচুর লোকে ভিড় করে এই মেলা দেখতে  ।  বড় বড় দোকানপাট, সারি সারি কুলুর বিখ্যাত শালের দোকান, হোটেল নিয়ে কুলু বেশ জমজমাট  শহর। বেশ কাটল বিকালটা আমাদের মেলা ঘুরে।

পরেরদিন  ভুন্টার থেকে দিনে দিনে  ঘুরে এলাম ৩৫ কিমি দূরত্বের মণিকরণ  থেকে ।  পার্বতী নদীর  তীর  দিয়ে কসোল, হয়ে  পৌঁছালাম মণিকরণ ঘন্টা দেড়েকের ভেতর। মণিকরণ হিন্দু ও শিখ দুই সম্প্রদায়ের কাছেই খুব পবিত্র  স্থান । রয়েছে শিব পার্বতীর মন্দির ও গুরুদ্বারা।  পার্বতীর  কানের মনিকুণ্ডল পড়ে গিয়েছিল এইখানে। আর গুরু নানক এসে কিছুদিন ছিলেন এই মণিকরণ। এখানকার উষ্ণপ্রস্রবণ খুবই বিখ্যাত।  প্রচুর মানুষকে স্নান করতে দেখলাম এই  উষ্ণপ্রস্রবণে। আর দেখলাম গরমজলে চালভরা থলি ও হাঁড়ি ডুবিয়ে ভাত বানাতে। কুলু হয়ে ফেরার পথে দেখে নিলাম বৈষ্ণোদেবী মন্দির।  এক ফ্যাক্টরি থেকে কুলুর চাদর কিনলাম নিজের ও প্রিয়জনদের দেওয়ার জন্য।

আমরা এই দিন সকালে জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম নাগ্গর হয়ে মানালির পথে । বিপাশা নদীর ওপর সেতু পার হয়ে পূব পাড়  দিয়ে কিছুদুর যাবার পর পৌঁছে গেলাম নাগ্গরে। সেখান থেকে ১ কিমি ওপরে পাহাড়চূড়ায়  রোয়েরিখ আর্ট গ্যালারিতে। রুশ শিল্পী নিকোলাস রোয়েরিখ ও তার ছেলে নাগ্গরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে থেকে গিয়েছিলেন এই বাড়িতে। তাঁদের আঁকা অসাধারণ সব ছবি দেখে মুগ্ধ হলাম।।  এখান থেকে আমি পায়ে হেঁটে ঢালু পথে ফটো তুলতে তুলতে নেমে এলাম নাগ্গরের  প্রাসাদে। আমার সঙ্গীরা এলো গাড়িতে।  কাঠের  সুন্দর কারুকার্য করা এই প্রাসাদ তৈরি করেন রাজা সিধ সিংহ। আমাদের টিকিট কাটতে হলো প্রাসাদে ঢুকতে ।  প্রাসাদের অনেকটাই এখন HPTDC হোটেলের দখলে। আমরা এখানে রেস্তোঁরায়  দুপুরের খাবার সারলাম। নাগ্গার দেখে বিপাশা  নদীর পূব পাড়  দিয়ে জগৎশুখ  হয়ে আমরা ২০ কিমি দূরত্বে মানালি পৌঁছাতে সন্ধ্যে হয়ে গেল । আমরা উঠলাম বিপাশা নদীর পশ্চিম তীরে ও ২১ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে  HPTDC র হোটেল বিয়াসে। এই হোটেল টি খুব সুন্দর  জায়গায়। হোটেলের পেছনে বাগানের ধার দিয়ে বয়ে চলেছে বিপাশা নদী।  ঘরের মধ্যে থেকেও তার গর্জন কানে আসছিল। সেদিন পায়ে হেঁটে গেলাম ম্যালে।  দোকানপাট, রেস্তোঁরা, লোকজন নিয়ে একটু ঘিঞ্জি লাগল  মানালি।

পরেরদিন কাছাকাছির মধ্যে দেখে নিলাম দেওদার গাছে ছাওয়া মনোরম স্থানে হিড়িম্বা মন্দির ও  মানালসু  নদীর ধারে ক্লাব হাউস ।  মানালি  এসে সবাই একবার  ঘুরে আসে ৫১ কিমি দুরে, ৩৯৭৮ মিটারে অবস্থিত রোটাং পাসে।  খারাপ আবহাওয়ার জন্য রোটাং বন্ধ থাকায়  আমরা  ওই  পথে পলচন  পৌঁছে বাঁদিকের রাস্তায় ঢুকে ঘুরে নিলাম সোলাং ভ্যালি। সবুজ ঘাসে ঢাকা এক সুন্দর উপত্যকা। এখানে নানা রকম এডভেঞ্চার স্পোর্টসের ব্যবস্থা আছে।  শীতে স্কি হয় এখানে।  আমি ও আমার বান্ধবী রোপওয়ে তে চড়ে  ৩২০০ মিটার উচ্চতায় পৌঁছালাম। এখান থেকে রোটাং পাস সহ অন্যান তুষারশৃঙ্গ  খুব  কাছ থেকে দেখা  যায় । এখানে বসে এক কাপ চা ও পপকর্ন খেয়ে নেমে এলাম নিচে। মানালি ফেরার পথে দেখে নিলাম বশিষ্ঠ মুনির মন্দির।  বেশ ঠান্ডা ছিল সেদিন ।  তাড়াতাড়ি  খেয়ে শুয়ে পড়লাম আমরা পরেরদিন খুব ভোরে  বেরিয়ে প্লেন ধরতে হবে বলে । সারারাত খুব ঝড় বৃষ্টি হল।

ভোরের আলো না ফুটতেই বেড়িয়ে পড়লাম ৫০ কিমি দুরের ভুন্টার বিমানবন্দর থেকে দিল্লি যাওয়ার প্লেন ধরতে। তখনো বৃষ্টি পড়ছিল। রাজু আমাদের ভুন্টার বিমানবন্দরে  নামিয়ে চলে গেল। খুবই ছোট বিমানবন্দর। খারাপ আবহাওয়ার জন্য আমাদের প্লেন ছাড়বে কিনা  সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল  ।  শেষে আবহাওয়া ভালো হতে  ঘন্টা চারেকের দেরিতে প্লেনে দিল্লি পৌঁছালাম। সেখান থেকে  আমাদের কলকাতা ফেরার প্লেন ছিল রাতে।

কোথায়  থাকবেন :

সিমলাতে -
হিমাচল প্রদেশ ট্যুরিজিমের  হোটেল হলিডে হোম ( ০১৭৭- ২৮১২৮৯০)
সিমলা কালীবাড়ি (০১৭৭ - ২৬৫২৯৬৪)
হোটেল ভিকট্রি (০১৭৭ - ২৬৫২৬০০)

সারাহানে -
হিমাচল প্রদেশ ট্যুরিজিমের  হোটেল শ্রীখন্ড (০১৭৮২ - ২৭৪২৩৪)
ভীমাকালী মন্দির কমিটির গেস্টহাউস - (০১৭৮২-২৭৪২৪৮)
হোটেল সাগরিকা - (০১৭৮২-৪০৬৬-০২৩৫)

সাংলা -
প্রকাশ রিজেন্সি - (০৯৮১৬২৮৩২৬৮)
লেক ভিউ রিসোর্ট - (০৯৮৩০১৮৯৭৭৮)


ছিটকুল -
যাযাবর ক্যাম্প - (০৯৮৭৪৩৭৩৩৮০)
মাস্তারাং ক্যাম্প - ০৯৮৩১৬ ৪২৪৫৬)
পাঞ্চালি রিসোর্ট - (০৯৮৩০২-৫৮৮২৮)

কল্পাতে -
হিমাচল প্রদেশ ট্যুরিজিমের হোটেল কিন্নর কৈলাস  (০১৭৮৬ - ২২৬১৫৯)
কিন্নর ভিলা - (০১৭৮৬-২২৬০০৬)
কৈলাস ভিউ গেস্ট হাউস - (০১৭৮৬-২২৬১৫৮)

রামপুর -
সতলুজ ভিউ গেস্ট হাউস - (০১৭৮২-২৩৩৯২৪)
হিমাচল প্রদেশ ট্যুরিজিমের হোটেল বুশাহর -(০১৭৮২ -২৩৪১০৩)

ভুন্টারে -
বালাজী ইন  (০১৯০২-২৬৫০৯৬)
হোটেল সান বিম  (০১৯০২-২৬৫১৯০)

কুলু -
হিমাচল প্রদেশ ট্যুরিজিমের হোটেল শর্বরী - (০১৯০২-২২২৪৭১)
হোটেল বিজলেশ্বর ভিউ - (০১৯০২-২২২৬৭৭)
হোটেল সবলা ইন্টারনাসানাল - (০১৯০২-২২২৮০০)

মণিকরণ -
হোটেল  সিলভার ফেস  (০৯৪১৮২-০১৯৪৭)
হোটেল শীবালিক - (০১৯০২-২৭৩৮১৭)

মানালি -
হিমাচল প্রদেশ ট্যুরিজিমের  হোটেল বিয়াস (০১৯০২-২৫২৮৩২)
হোটেল রোটাং মানালসু - (০১৯০২-২৫২৩৩২)
হিড়িম্বা কটেজ - (০১৯০২ - ২৫২৩৩৪)


কীভাবে যাবেন:

কলকাতা থেকে যেকোনো প্লেনে দিল্লি গিয়ে ওখান থেকে ট্রেনে কালকা অথবা চন্ডিগড় পৌঁছে  গাড়ি করে সিমলা পৌঁছানো যায় । দিল্লি থেকে সরাসরি প্লেন আছে সিমলার জুবারহাটি বিমানবন্দরে। হিমাচল প্রদেশে ঘোরার  জন্য গাড়িভাড়া করে নেওয়াটাই সবচেয়ে সুবিধাজনক। তাতে ঘোরার আনন্দটাও থাকবে আর সময়ও বাঁচবে। পাঁচ আসনের বড় গাড়ি নিলে ৩০০০ থেকে ৩৫০০ টাকা লাগবে দিন প্রতি।

পাখির খোঁজে "চুপির চর" (Chupir Chor)

শীত পড়লেই  মনটা ছটপট করে বেড়াতে যাবার জন্য। তাই এক বন্ধু কে সাথে নিয়ে পৌঁছে গেলাম পাখি দেখতে বর্ধমান জেলা অন্তর্ভুক্ত কাষ্ঠশালি পাখিরালয়ে । কলকাতা থেকে মাত্র ১২০ কিমি দূরত্বে অবস্থিত এই স্থান পর্যটক মহলে  "চুপির চর"  নামে  পরিচিত বেশি । স্থানীয় লোকের কাছে এটি ছাড়িগঙ্গা নামেও পরিচিত।  এই স্থান হুগলী নদী  থেকে কেটে যাওয়া অশ্বখুরাকৃতি একটি  হ্রদ। শীতে নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে এখানে। 








অনেকে দিনে দিনে ঘুরে আসে। আমরা ঠিক করলাম শুক্রবার অফিস করে বিকালের ট্রেনে পূর্বস্থলি পৌঁছাব ও পরেরদিন ভোরে বেরিয়ে নৌকো করে পাখি দেখতে বেরোব ।  হটাৎ ঠিক হওয়ায় কোথাও থাকার জায়গা পারছিলাম না। তখন ইন্টারনেট ঘেঁটে একটি বিয়েবাড়ি ভাড়া দেয় এইরকম একটি বাড়ির (Dream  Destiny অনুষ্ঠান হল) সন্ধান পেয়ে  ফোন করলাম ও মালিকের সাথে কথা বলে  থাকার ব্যবস্থা ঠিক করে ফেললাম। আমরা বিকাল ৫টার হাওড়া - কাটোয়া লোকালে যখন পূর্বস্থলি পৌঁছালাম তখন ঘড়িতে বাজে রাত ৮টা। সপ্তাহন্তে সবাই বাড়ি ফিরছে তাই ট্রেনে ঠাসা ভীড় ছিল।  বেশ বেগ পেতে হল ভিড় ঠেলে উঠে আসন নিতে। অবশ্য আমাদের উৎসাহে তাতে এতটুকু খামতি হয়নি। ট্রেনে ফেরিওয়ালার থেকে চাল ভাজা, মিষ্টি, তিলের খাজা, চা খেতে খেতে সময় কেটে গেল।   নবদ্বীপ স্টেশনের পর দুটো স্টেশন ছেড়ে পূর্বস্থলি। একে মফস্বল , তাতে আবার শীতের রাত, কেমন চারিদিক নিঝুম হয়ে পড়েছে। তাই হাঁটা পথ হওয়া সত্বেও আমরা স্টেশনে নেমে একটা টোটো তে করে হোটেলে পৌঁছালাম। একেবারে রেল লাইনের  ধারে এক নম্বর প্লাটফর্মের শেষ প্রান্তের কাছে এই হোটেল। কেয়ার-টেকার কেষ্ট আমাদের ঘর দেখিয়ে দিয়ে রাতের খাবার আনতে চলে গেল। হাত পা ধুয়ে তৈরী হতে হতে কেষ্ট খাবার নিয়ে চলে এল।  গরম গরম ভাত, রুটি, তরকারি  ও মুরগীর  ঝোল দিয়ে রাতের খাবার সারলাম। হোটেলের ম্যানেজার পরেরদিনের টোটোর বন্দোবস্ত করে দিলেন,  যে আমাদের নিয়ে কাষ্ঠশালি ঘাটে যাবে ভোর ৫টায় । তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম পরেরদিন ভোরে উঠতে হবে বলে। 

কাঁটায় কাঁটায় ভোর ৫টাতে  টোটো এসে দাঁড়ালো হোটেলের দরজায় । বাইরে তখনো  আকাশে আলো ফোটেনি। ঠান্ডা বেশি ছিল না কিন্তু মেঘলা থাকায় একটু শীত শীত ভাব ছিল। আমরা জবুথবু হয়ে টোটো তে উঠে  বসে পড়লাম। চালকের নাম সুদর্শন । কথা বলতে জানলাম সে দিনের বেলায় টোটো চালায় আর রাতে নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে যায় । দেখলাম পূর্বস্থলির মানুষজনের  ঘুম তখন ভাঙেনি। যখন নৌকা ঘাটে এসে নামলাম  তখনও বেশ অন্ধকার ।  একজন মাঝি  এগিয়ে আস্তে তাকেই জিজ্ঞাস করলাম কত ভাড়া নেবে বলে।  জানলাম নৌকো বিহার করতে ঘন্টাপ্রতি দেড়শো টাকা ভাড়া পড়বে । দাম বেঁধে দেওয়া আছে আগের থাকতেই। ঠিক হল আকাশ একটু পরিষ্কার হলেই আমরা বেরিয়ে পরবো পাখিদের স্বর্গ রাজ্যে দেখতে ।  সুদর্শনের  কাছে জানলাম যে আমরা পূর্বস্থলি  ঘাট থেকে নৌকা ভাড়া নিয়েও  ঘুরতে পারতাম।  চুপির চর  ও কাষ্টস্থালি এই দুই জায়গাকে  নিয়ে গড়ে উঠেছে  আনন্দনগর পর্যটনকেন্দ্র। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সহযোগিতায় স্থানীয় পঞ্চায়েত আর বর্ধমান জেলা পরিষদ পাখিরালয়টিকে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলেছে। ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৭০ টি প্রজাতির পাখি এসে ডেরা বাঁধে এখানে। পুরো হ্রদ ঘুরে দেখতে  সময় লাগে ছয় থেকে সাত ঘন্টা। হাতে তিন বা চার ঘন্টা থাকলেও যথেষ্ট।

আলো ফুটতেই পাখির কলকাকলি কানে এল। নৌকায় উঠে পড়লাম। মাঝির নাম হারাধন। জানতে চাইলাম পাখি চেনে কিনা। মাথা নেড়ে বলল সে পাখির নাম সব জানে, শিখেছে পর্যটকদের কাছ থেকে। আর জানলাম এই হ্রদ খুব একটা গভীর নয়।  আট থেকে নয় ফুট গভীর কোথাও কোথাও। নৌকায় ভেসে বেড়াতে  বেড়াতে  খুব কাছ থেকে দেখলাম বহু প্রজাতির পাখি যেমন ডুবুরি হাঁস, পানকৌড়ি , মাছরাঙা, বালিহাঁস , সরাল , বাহ্মনী  ডাহুক, বক, সুচিপুচ্ছ আরও কত নাম জানা, অজানা বহু পাখি।  সাদা বকের ঝাঁক মাথার উপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখলাম ।  লাল মাথা গোলাপি ঠোঁটের রাঙ্গামুড়ি  দেখতে পেলাম আমাদের মাঝির জন্য । পাখি বসবে বলে  কিনা জানি না, তবে দেখলাম হ্রদের মধ্যে অনেক জায়গায় বাঁশ পোঁতা আছে। যাতে অন্য পাখি ছাড়াও নীল মাছ রাঙা ও পানকৌড়ি  এসে বসেছে । পরিযায়ী হাঁসের ঝাঁক অনবরত পাক খাচ্ছে মাথার উপর দিয়ে।  কয়েকটা  চাতক পাখির সেকি ব্যাস্ততা।  মাথার উপর ঘুরে পাক খাচ্ছে আর  সজোরে এসে জলে ডুব দিচ্ছে। নৌকা  ভেসে চলেছে কচুরিপানার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। দেখলাম  কচুরিপানার মধ্যে দিয়ে গলা উঁচু করে দেখছে নাম না জানা একটি নীল পাখি। যেইনা ক্যামেরা তাক করেছি অমনি ডানা মেলে উড়ে গেল। কিছুদূরে লেসার হুইসিলিঙ হাঁসের দল ভেসে বেড়াচ্ছে। অত্যন্ত সতর্ক। আমাদের নৌকা এগিয়ে যেতেই উড়ে গিয়ে স্থান বদল করল ।  ইতিউতি ভেসে বেড়াচ্ছে বেশ কয়েকটি জেলে নৌকো। জাল ফেলে মাছ ধরছে। দেখা যায় কাছে পিঠের গ্রামের লোকেদের রোজকার কাজও ।  হটাৎ বৃষ্টি শুরু হয়ে যাওয়াতে আমাদের নৌকা বিহার সময়ের আগেই শেষ করতে হল । এবার নৌকা এসে যেখানে ভিড়ল সেইখানে বর্ধমান জেলা পরিষদ একটি  নজরমিনার তৈরি করেছে। সেটি বন্ধ ছিল, কিন্তু নিচে দাঁড়িয়েই  বুঝলাম  যে উপর থেকে জলাভূমির বিস্তার দারুন লাগবে দেখতে । বেশ জোরে বৃষ্টি পড়ছিল।  আমরা একটা সিমেন্টের ছাতার তলায় আশ্রয় নিলাম। আরো কিছুটা সময় নৌকাতে কাটাবার ইচ্ছে ছিল কিন্তু নিম্নচাপের বৃষ্টি, সেতো থামার নয়, তাই বৃষ্টি একটু ধরতে হ্রদের পার বরাবর হেঁটে প্রধান ঘাটে ফিরলাম। আবার জোরে বৃষ্টি নামতে টোটোওয়ালা কে  ফোন করলাম যাতে সে এসে আমাদের নিয়ে যায়।  দেখলাম আমাদের পরে যারা ঘাটে পৌঁচেছে তাদের আর নৌকা বিহার করা হল না বৃষ্টির জন্য।  শুনলাম জানুয়ারী মাসে নাকি আরো পাখি আসে। তাই তখনি ঠিক করে ফেললাম আগামী মাসে আবার আসব  পাখি দেখতে।

হাতে অনেক সময় থাকায় পারুলিয়া বাজারে গেলাম গুড় কিনতে। সেখানে জলখাবার খেয়ে খেঁজুরের টাটকা ঝোলা গুড় ও পাটালি কিনে দুপুর ১১ টার  কাটোয়া-হাওড়া লোকাল ধোরে ফিরলাম হাওড়া তে। তখন কানে শুধু পাখির গান ভাসছিল। 

কিভাবে যাবেন:
কলকাতা থেকে সড়ক পথে দুরুত্ব ১২০ কিঃমিঃ।  এছাড়া শিয়ালদা বা হাওড়া থেকে কাটোয়া লোকালে এসে নামতে হবে পূর্বস্থলি স্টেশনে। স্টেশন থেকে মিনিট ২০ দুরুত্বে চুপির চর।  স্টেশন থেকে টোটো পাওয়া যায়।  কলকাতা থেকে গাড়িতে এলে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে কৃষ্ণনগর হয়ে নবদ্বীপে আস্তে হবে।  সেখান থেকে পারুলিয়া মোড় হয়ে পূর্বস্থলি  পৌঁছানো যায়। 

কোথায় থাকবেন:
পরিযায়ী আবাস - ৯৭৩২১ ৪২৩৬২
ড্রিম ডেসটিনি - ৮৩৪৮১ ৬৯৮৪৪

টোটো বা মাঝির দরকার হলে যোগাযোগ করতে পারেন :
সুদর্শন - ৭৩১৯২০৯৬৮৫
হারাধন মন্ডল - ৯৬৩৫৫ ৪৭৪৮৫