আমি, বাবা, মা, আর আমার স্বামী চারজন মিলে ভোরের বিমানে থাইল্যান্ডের রাজধানি ব্যাংককের উদ্যেশে রওনা হলাম। কলকাতা থেকে প্রতিদিন বিমান যাচ্ছে ব্যাংককে। মাত্র আড়াই ঘন্টার উড়ান। ভারতীয় সময়ের থেকে থাইল্যান্ডের সময় দেড় ঘন্টা এগিয়ে। ঠিক ছিল আমরা ব্যাংকক থেকে বিমান বদলে সোজা ক্র্যাবি যাব। ব্যাংককে দুটি বিমানবন্দর - সুবর্ণভূমি ও ডন ম্যূয়াং। আমরা ডন মুয়াং বিমানবন্দরে থেকে ক্র্যাবি গামী বিমান ধরলাম। ব্যাংকক থেকে ক্র্যাবি যেতে দেড় ঘন্টা লাগল ।
বিমানবন্দর থেকে নিয়ে যেতে রিসোর্ট থেকে গাড়ি পাঠিয়েছিল। ক্র্যাবি থাইল্যান্ডের দক্ষিনের একটি রাজ্য। কিছুক্ষনের মধ্যেই আমাদের নিয়ে গাড়ি ছুটল ঘন সবুজ জঙ্গল ও পাহাড়ে ঘেরা ঝাঁ-চকচকে মসৃন রাস্তা দিয়ে। ড্রাইভার ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে জেনে নিলো আমাদের দুপুরের খাওয়া হয়েছে কিনা। কলকাতায় হাল্কা ঠান্ডা ছিল। এখানে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে বসে বাইরের তাপমাত্রা টের পাচ্ছিলাম না। ড্রাইভার আমাদের নিয়ে গেল গ্রামের একটা ছোট্ট রেস্তোরাঁ তে। এবার টের পেলাম বাইরে বেশ গরম । কিন্তু চারপাশে গাছ গাছালি থাকায় কষ্ট তত হল না। এখানে আমরা থাইল্যান্ডের স্পেশাল খাবার পদ-থাই খেলাম। অনেকটা চাইনিজ চাউমিন ও ফ্রাইড রাইসের মত। পলাশ ফুল ফুটে থাকতেও দেখলাম এখানে। আর সাথে কোকিলের ডাকে পুরো বসন্তের আমেজ আনল মনে। সবুজে সাজানো ক্র্যাবির প্রধান আকর্ষণ অপূর্ব প্রকৃতি ও একাধিক সাগরসৈকত।
আমাদের রিসোর্ট "বিয়ন্ড ক্রাবি" - ক্র্যাবি টাউনের উত্তর পশ্চিম দিকে Klong Muang সৈকতে। কিছুক্ষনের মধ্যে গাড়ি রাস্তা ছেড়ে রিসোর্টের গেটে ঢুকে পড়লো। বেশ কয়েকটি স্বতন্ত্র কটেজ ও সুন্দর সাজানো বাগানের ভেতর দিয়ে এসে দাঁড়ালো লবির বাইরে । আমরা নেমে রিসেপশনে ঢুকতে টের পেলাম আমরা পাঁচ তলার উপর দাঁড়িয়ে আছি। চোখ গেলো কাঁচের বাইরে স্বচ্ছ পান্না রঙা আন্দামান সাগরের দিকে। চারিদিকে ছায়া মেলেছে নারকেল, ক্যাসুরিনা, রবার, আম সহ নানা গাছগাছালি। আর রয়েছে সবুজে মোড়া অজস্ৰ টিলা পাহাড়। আমরা ঠিক রিসেপশনের নিচের তলায় পাশাপাশি দুটো সি ভিউ রুম পেলাম । হোটেল আগেথেকেই অনলাইনে বুক করা ছিল।রিসোর্টটি চমৎকার জায়গায় অবস্থিত। আমরা ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালাম। সামনে সমুদ্র আর নিচে সুন্দর বাগান ও তার সংলগ্ন লম্বা সুইমিং পুল। সাগরতট ও পুলে রঙিন ছাতার নীচে ডেকচেয়ারে সব বিদেশিরা রোদ পোয়াচ্ছে। পুলের ৩০ মিটার ব্যাবধানে রুপোলি বালির সৈকত । বাইরে রোদ্দুর চড়া থাকায় আমরা ঘরে ঢুকে বিশ্রাম নিলাম কিছুক্ষন। বাইরে সৌন্দর্য্যের হাতছানি এতটাই যে বেশিক্ষন ঘরে থাকাও গেলো না। আমরা নিচে রিসোর্টের সমুদ্রের ধারে কাফে তে বসে বিয়ারের মগে চুমুক দিতে দিতে সামনে ঢেউয়ের খেলা উপভোগ করতে লাগলাম। এখান থেকে আন্দামান সাগরের বুকে সূর্যাস্তের দৃশ্য অনবদ্য। সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত মাদকতার সৃষ্টি হয়।
এখানে সমস্ত হোটেল ও রিসোর্টে আছে থাই ম্যাসাজ পার্লার । আর দেখলাম আমাদের রিসোর্ট সংলগ্ন এবং সমুদ্রের ধারে একটি সুন্দর খোলা জায়গায় থাই ম্যাসাজের ব্যবস্থা। যত্ন সহকারে ও রিসোর্টের তুলনায় অনেক সস্তায় এখানে ম্যাসাজ করালাম । এই পার্লারের সামনে বিচের উপর একটি গাছের উপর থেকে দড়ির দোলনা ঝোলানো । ভারি ভালো লাগল সাগর পাড়ে দোল খেতে।
পরেরদিন সূর্য্য উদয় দেখবো বলে আমরা খুব ভোরে উঠে সমুদ্র সৈকতে গেলাম। উত্তর-পশ্চিম দিকে অবস্থিত হওয়ায়, সূর্যের দেখা মেলে দেরিতে। কিন্তু পাহাড়ের আড়াল থেকে যে রঙ ছড়ায় পুবের আকাশে তা দেখলে মনে হবে কেউ যেন নানা রঙের আবির লেপে দিয়েছে আকাশের গালে। আমরা আরো উত্তরে হাঁটলাম বিচের উপর দিয়ে । জল সরে যাওয়ায় খুব সহজেই পায়ে হেঁটে খুব কাছে সবুজে মোড়া একটি ছোট দ্বীপে পৌঁছালাম। ভারী চমৎকার লাগে চারপাশের সৌন্দর্য্য । এখানে বেশ কয়েকটি রঙিন নৌকা বাঁধা। অনেকটা আমাদের দেশের নৌকার মতো কিন্ত পেছন দিকটা ল্যাজের মতো উঁচু ও লম্বা, আর খুব সুন্দর সাজানো। এইগুলোকে থাইল্যান্ডে লং টেল বোট বলে। সূর্য ওঠার সাথে সাথে সাগরের জল এগিয়ে আস্তে থাকলো। আমরাও তাড়াতাড়ি দ্বীপ থেকে চলে এলাম মূল ভূ-খণ্ডে । আসার সময় হাঁটু জল পার হয়ে আস্তে হল। যে নৌকা গুলো বালিতে আটকে ছিল, ফেরার সময় দেখলাম সেগুলো দুলছে জল পেয়ে । বেলা বাড়তে দ্বীপটি আবার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো ।
আজ ফি ফি দ্বীপে যাবো ঠিক ছিল । সেখানে একরাত্রি কাটিয়ে পরেরদিন বিকালে ফিরে আসব। সেইমতো রিসোর্টের ট্রাভেল ডেস্কঃ থেকে আগাম টিকিট কাটা ছিল। ক্র্যাবির পশ্চিমে আন্দামান সাগরের সুনীল জলরাশির মাঝে জেগে রয়েছে ফি ফি দ্বীপ। ফি ফি দ্বীপে যাওয়া যায় ফুকেট অথবা ক্র্যাবি থেকে। ফি ফি দ্বীপের আশে পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আরও নানা দ্বীপ। আমরা কয়েক বছর আগে এই দ্বীপে দিন কয়েক কাটিয়েছিলাম। সেবার আমরা ফুকেট থেকে গিয়েছিলাম। ফি ফি দ্বীপপুঞ্জ ক্র্যাবি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত এবং জলপথে দূরত্ব মাত্র ৩৮ কিঃ মিঃ। সকাল আটটায় তৈরি হয়ে আমরা হোটেলের লবিতে গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। গাড়ি অন্যান্য হোটেল থেকে লোক তুলে তারপর আমাদের নিয়ে চলল আওনাং -এর "নপারাৎ থারা" ফেরিঘাটে। এখান থেকে ফি ফি দ্বীপে যাবার স্পিড বোট ও ক্যাটাম্যারন লঞ্চ ছাড়ে। যেখানে নামলাম সেটি খুব জনবহুল জায়গা এবং প্রত্যেকেই কোথাও না কোথাও যাবার উদ্যেশে বোট ধরতে এসেছে। এখানে প্রথমে আমাদের পাসপোর্ট দেখতে চাইলো। তারপর নম্বর দেওয়া কমলা রঙের গোল স্টিকার লাগিয়ে দিলো এক এক করে সবার জামার বুকে। আমরা সামনে দাঁড়ানো একটি দুতলা লঞ্চে উঠলাম, তার নাম আওনাং প্রিন্সেস । বড় দোতলা লঞ্চ, একতলা ও দুতলা তে শীততাপনিয়ন্ত্রিত বসার সু-ব্যবস্থা। আমরা সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম একেবারে উপরের ডেকে। এখানেও বসার ব্যবস্থা আছে। আমরা ছাড়া কোনো ভারতীয় ছিলনা। লঞ্চটা দাঁড়িয়েছিল একটি খাঁড়ি তে। ডেকে দাঁড়িয়ে প্রচুর ছোট-বড় নানা রঙের নৌকো আস্তে ও যেতে দেখলাম। নির্ধারিত সময় আমাদের লঞ্চ ভেঁপু বাজিয়ে ছাড়ল ও এগিয়ে চলল দক্ষিণ-পশ্চিম মুখ। এগিয়ে চলল ছোটবড় সমুদ্র থেকে মাথা উঁচু করে থাকা পাহাড়ের পাশ কাটিয়ে । বেশ লাগছিল। নানা ভঙ্গিমায় ফটো তুললাম সবার। অল্প কিছুদূর যাবার পর মাঝ সমুদ্রে নোঙ্গর ফেলে দাঁড়ালো আমাদের লঞ্চ, আরো যাত্রী তুলবে বলে। রাইলি, ফ্র্যানাং বিচের থেকে যাত্রীরা এল লং টেল বোটে চড়ে। বেশ গরম ছিল কিন্তু অপূর্ব সৌন্দর্য্য ও সাথে সমুদ্রের হাওয়া থাকায় খুব একটা টের পেলাম না সেটা । ঘন্টাখানেক চলার পর আস্তে আস্তে সামনে ফি ফি দ্বীপ স্পষ্ট হতে থাকল। হটাৎ মনে হবে বুঝি কোন সুবিশাল দূর্গ সমুদ্র থেকে মাথা তুলে আমাদের অভর্থনা জানাচ্ছে। প্রথম দর্শনেই চোখ জুড়িয়ে গেল । বামদিকে "ফি ফি লে" দ্বীপকে রেখে লঞ্চ থামল টনসয় বের ফেরিঘাটে । গোটাকয়েক লঞ্চ আর বেশ কিছু নৌকো নোঙর করা। আর সমুদ্রের পান্না সবুজ জলে ভেসে আছে ছোট বড় নানা রকমের রঙিন নৌকা। এই ফি ফি দ্বীপে প্রায় কয়েকশো লোকের মৃত্যু হয়েছিল ২০০৪ এর সুনামিতে। সমস্ত হোটেল, দোকানপাট, বাজার ধংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল গোটা দ্বীপ। এক যুগ পরে তার কোনো চিহ্ন থাকার কথা নয়। শুনেছি দু-তিন বছরের মধ্যে যারা এসেছিলো তারাও ধ্বংসাবশেষ দেখতে পায়নি। সুনামির পর সবই নতুন করে তৈরি হয়েছে। প্রচুর আয় হয় ট্যুরিজম থেকে তাই এতো উন্নতি হয়েছে ।
ফি ফি ডন ও ফি ফি লে নিয়ে ফি ফি দ্বীপপুঞ্জ। ফি ফি ডনের গড়ন অনেকটা ডাম্বেলের মতন যার মাঝের সরু অংশটা মাত্র ১৫০ মিটার চওড়া। সরু অংশটার এক ধারে টনসয় বে, আরেক ধারে লো-দালুম বে আর দুই ধারেই সমুদ্রসৈকত । মাঝে ঠাসা অজস্ৰ হোটেল, রেস্তোরাঁ, ট্যাটু বার , থাই ম্যাসাজ পার্লার, জামাকাপড়ের ও স্যুভেনির দোকান। এই দ্বীপে কোন গাড়ি নেই, তাই সব পায়ে চলার রাস্তা। আমরা এগিয়ে চললাম টনসয় গ্রামের ভেতর দিয়ে চেনা রাস্তা ধরে, যার ডান পাশে বিচের ধারে সারি সারি থাই খাবারের রেস্তোরাঁ । রাস্তার বাম ধারে থাকার বিভিন্ন মানের সব হোটেল, ট্রাভেল এজেন্টদের অফিস, ম্যাসাজ পার্লার, আর কতকীছু দোকানপাট । পথ চলার সময় অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম পেছনে একটা "পি-পি পি-পি" আওয়াজ কানে আসতে । দেখলাম এক ঠেলা বোঝাই মাছ নিয়ে একটি লোক এগিয়ে যাবে বলে পাস চাইছে । এটাই এখানের হর্ন! আমরা একটি রিসোর্টে উঠলাম তার নাম বানিয়ান ট্রি । ঠান্ডা তরমুজের শরবত দিয়ে আমাদের অভর্থনা জানাল।
ফি ফি ডন এর উচ্চতম জায়গা ফি ফি ভিউ পয়েন্ট। এই ভিউ পয়েন্টর উচ্চতা মাত্র ১৮৬ মিটার । কিছুটা পায়ে হাঁটা রাস্তা ও তারপর কংক্রীটের খাড়া সিঁড়ি পাহাড়ের উপর উঠে গেছে। পথের ধারে বিশ্রাম নেওয়ার জায়গাও আছে। উপর থেকে পুরো দ্বীপটার সৌন্দর্য্য অসাধারণ। এখান থেকে ফি ফি লে দেখা যায় আর দেখা যায় টনসয় গ্রাম ও লোহা ডালুম বে। এখানে আসার সেরা সময় সকাল ৯.০০ টার মধ্যে । সেই সময় সূর্যের নরম আলোয় চারিধার রহস্যময় দেখায় । ভিউ পয়েন্টের ওপর দিক থেকে আরো তিন টি রাস্তা নেমে গেছে দ্বীপের অন্যান্য প্রান্তে যাবার জন্য। সাধারণত স্থানীয় বাসিন্দারা এই সব রাস্তা ব্যবহার করে থাকে । ভেবে ছিলাম উপরে চড়ব কিন্তু রোদ্দুর বেশ চড়া থাকায় আর ইচ্ছে করল না।
দুপুরের আহার সারলাম একটি বিচের উপর থাই খাবারের রেস্তোরাঁ তে। এখানে ৬৫০ গ্রামের একটা sea bass খেলাম। অনেকটা খেতে আমাদের ভেটকি মাছের মত। বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে দিয়েছিলো পাতে। বিকালে রোদ পড়তে গেলাম টনসয় এর ওপর দিকে লো-দালুম বে তে । প্রচুর বিদেশীর আনাগোনা এখানে। ভারতীয় নেই বললেই চলে। এখান থেকে টুকিটাকি কেনা কাটা সেরে ফেললাম। সন্ধে নামতে দোকানপাটে আলো জ্বলে উঠল। দেখলাম দোকানিরা তেল ভোরা কাঁচের বোতলে আগুন জ্বালিয়ে বালিতে গেঁথে দিয়ে গেলো পুরো সৈকতে । মশালের আলো এক অদ্ভুত আলোছায়ার মায়া তৈরী করলো। আমরা সমুদ্রের তীরে বালিয়াড়িতে বসে বিয়ারের বোতলে চুমুক দিলাম । সাথে হালকা সি-ফুড সহযোগে ডিনারও সেরে ফেললাম এখানে ।
টনসয় ফেরিঘাটের কাছে বুকিং কাউন্টার থেকে পরেরদিনের একটা প্যাকেজ ট্যুর কিনে নিলাম, স্পিড বোটে করে ফি ফি লে ও আসে পাশের দ্বীপগুলি ঘুরে দেখব বলে । হাতে সময় থাকলে অনেকে লং টেল বোটে চোরেও ঘুরে ন্যায় । ফি ফি লে দ্বীপটি জনবসতিবিহীন । আছে পাহাড় ও তার আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা কিছু সুন্দর সমুদ্র সৈকত ও গুহা । পরেরদিন খুব সকাল সকাল আমরা জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। টনসয় ফেরিঘাট থেকে স্পিড বোট ছাড়ল। আমরা ছাড়া আরো জনা দশেক বিদেশী ছিল বোটে । কিছুটা গিয়েই টনসয় বের মুখের কাছে নোঙ্গর ফেলল । এখানে আমাদের হাতে স্নরকেলিং এর সরঞ্জাম দেওয়া হল। এখানে সমুদ্রের গভীরতা প্রায় দু-তিন তলা বাড়ীর সমান। আমরা নির্দেশ মতো লাইফ জ্যাকেট চড়িয়ে, চোখে ও নাকে জলনিরোধক মাস্ক আর প্লাস্টিকের নল লাগিয়ে নেমে পড়লাম সমুদ্রে সাদা সার্ক দেখতে। আমার সঙ্গী তিনজন বোটে বসে ছিল । সাঁতার জানলেও এত গভীর সমুদ্রে সাঁতার কাটার অভ্যিগতা নতুন, তাই প্রথমটা একটু ভয়ই করছিল। আন্দামানে কোমড় জলে স্নরকেলিং করার অভিজ্ঞতা আগেই ছিল তাই অসুবিধা হল না খুব একটা। কিছুক্ষন পর ধাতস্থ হওয়ায় উপুড় হয়ে জলের মধ্যে চোখ ও মাথা ডুবিয়ে ভাসতে লাগলাম আর নলের সাহায্যে শ্বাস নিতে নিতে দেখলাম সমুদ্রের তলার এক অপূর্ব সৌন্দর্য্যে ভরা জগৎ। এখানে সমুদ্রের জল খুবই স্বচ্ছ থাকায় সূর্যের আলোতে বেশ অনেকটাই গভীর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। হলুদ, সবুজ, নানা রঙের মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে খেলে বেড়াচ্ছে। খুব কাছেও চলে আসছে কখনো সখনো। ধরতে গেলেই পালিয়ে যাচ্ছে। সাদা সার্কও দেখলাম এখানে। স্নরকেলিং শেষ করে বোটে উঠে এলাম।
আমাদের পরের গন্তব্যস্থান ফি ফি লে দ্বীপ। ক্রমশ কাছে আস্তে থাকল দূর থেকে দেখা খাড়াই পাহাড়ে ভরা ফি ফি লে দ্বীপটা। পাহাড়ের সারি সমুদ্রের জল থেকে সোজা ওপরে উঠে গেছে। পাহাড়ের গা ঘেঁষে চললাম আমরা। কিছুক্ষনের মধ্যে আমাদের বোট বাঁক নিয়ে একটা খাঁড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ল। চোখের সামনে হটাৎ ভেসে উঠলো অসম্ভব সুন্দর এক জায়গা । এই জায়গা টা অনেকটা অর্ধচন্দ্রাকার। তিনদিকে উঁচু সবুজ পাহাড়ের কোলে ঘন সবুজ রঙের জল মিলেমিশে অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরো নৌকা ভাসছিলো। আমাদের সহযাত্রীরা অনেকেই তখন নেমে পড়েছে স্নরকেলিং করতে। আমিও ঝাঁপ দিলাম জলে। বেশ কিছুক্ষন চিৎ সাঁতারে গা ভাসিয়ে দিলাম আকাশের দিকে চেয়ে। তারপর স্নরকেলিং করে যা দেখলাম তা অতুলনীয়। মনে হলো বুঝি কোনো বিশাল রঙিন টেলিভিশনে ডিসকভারি চ্যানেল দেখছি। এক আশ্চর্য সুন্দর রূপ। গোলাপি, হলুদ, কমলা, লাল কত সব রঙের প্রবালের জঙ্গল। আর তার ভেতর ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ ভেসে বেড়াচ্ছে। বেশ কিছুক্ষন জলে কাটিয়ে বোটে উঠে পড়লাম। লক্ষ্য করলাম বোট থেকে বেশ কিছুটা দূরে পাহাড়ের ধারে কিছু বড় বড় পাথর এবং পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একটা দড়ির সিঁড়ি ফেলা । আমাদের পরের গন্তব্য ছিল ফি ফি লের সব থেকে অন্যতম জায়গা মায়া বে। এইখানে লিওনার্দো ক্যাপ্রিও অভিনীত হলিউড সিনেমা "The Beach" এর শুটিং হয়েছিল। আমরা হতাশ হলাম জেনে যে সমুদ্রের জল কম থাকায় সেখানে বোট যাবে না। ওই দূরের দড়ির সিঁড়ি টি দেখিয়ে বোট চালক জানাল যে যদি কেউ মায়া বে দেখতে একান্তই ইচ্ছুক থাকে তারা ওই দড়ি বেয়ে দ্বীপের ভেতর দিয়ে মিনিট দশেকের রাস্তা পায়ে হেঁটে পার করে মায়া বে দেখে আস্তে পারে । অনেকেই যেতে রাজি হয়ে গেল। আমিও উৎসাহিত হয়ে এডভেঞ্চারের নেশায় জলে ঝাঁপ দিলাম । বেশ কিছুটা সাঁতরে গিয়ে ওই বোট থেকে দেখা বড় বড় পাথর গুলোর কাছে পৌঁছালাম। তারপর খুব সন্তর্পনে ধারালো সব পাথরের পাশ কাটিয়ে দড়ির সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম। উপরে উঠে যা দেখলাম তা অতুলনীয়। দেখলাম নির্জন সুন্দর সাজানো একটা গ্রাম জঙ্গলের মধ্যে । দেখতে দেখতে এগোতে লাগলাম। এটি আসলে "The Beach " সিনেমার সেট। সেই জঙ্গল-গ্রামের শেষপ্রান্তে একখণ্ড রুপালি বেলাভূমি মায়া বে। তিনদিকে উঁচু পাহাড় আর সামনে খোলা পান্না সবুজ সমুদ্র। বসে পড়লাম সৈকতে আর দু চোখ ভোরে চারিদিকের শোভা উপভোগ করতে লাগলাম। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই যে ভেতরে এইরকম একটা নৈসর্গিক স্থান আছে। সমুদ্রের হালকা হালকা ঢেউ এসে আমায় ঘিরে ফেলছিল। আর তাতে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ খেলে বেড়াচ্ছিল। বেশ কিছুটা সময় এখানে কাটিয়ে আমি বাকিদের সাথে হেঁটে এবং তারপর সাঁতরে ফিরে এলাম বোটে।
আবার বোট ছাড়ল। এবার গন্তব্যস্থল মাংকি বে। এটি ফি ফি লের পূর্ব দিকে ছোট একটি সমুদ্র সৈকত। আমাদের স্পিড বোট কাছাকাছি পৌঁছে থামল । তারপর আমরা ছোট ছোট রবারের ভেলায় করে পৌঁছালাম মাংকি বে তে । সমুদ্র ও রুপালি বালি, সবুজ পাহাড় আর নীল আকাশ সব মিলিয়ে নৈস্বর্গিক জায়গা । এখানে প্রচুর বাঁদরের দেখা মিলল, বুঝলাম দ্বীপের নাম সার্থক। যাত্রীদের কাছ থেকে খাবারের আসায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশ কিছুক্ষন কাটিয়ে আবার বোটে উঠলাম। এবার ফি ফি ডনের টনসয় বে তে ফিরতে হবে । সময়ের মধ্যে ফিৱে এলাম। রিসোর্টে চেকআউট করে যখন ফেরিঘাট এ পৌঁছালাম তখন বেলা তিনটে। লঞ্চ ছাড়বে সাড়ে তিনটে। লঞ্চ এগিয়ে চলল ক্র্যাবির দিকে।
ক্র্যাবি ঘুরতে গাড়ি ভাড়া করতে হয়। ক্র্যাবি টাউন অঞ্চলে একাধিক ট্যুর অপারেটর আছে যাদের একজনের কাছ থেকে সাইটসিয়িং প্যাকেজ বুক করে ঘুরে নিলাম দ্রষ্টব্য জায়গাগুলি । এখানে একধরণের যাত্রীবাহি গাড়ি চলে যাকে এরা টুক টুক বলে। গাড়িটির একপাশে মোটরসাইকেল ও আরেকদিকে লোকজনের বসার ব্যবস্থা। ব্যাঙ্ককে টুক টুক দেখলাম অনেকটা আমাদের দেশের অটো রিকশার মতো দেখতে। শুধু তুলনায় বেশ বড়।
ক্রাবি থেকে আমরা বিকালের বিমানে ব্যাঙ্ককের ডন ম্যূয়াং এসে পৌঁছালাম। বিমানবন্দর থেকে শহরে যেতে ট্যাক্সি ভাড়া করা যায় । আমরা চারজন ছিলাম ও সাথে মালপত্র থাকায় আমাদের দুটো ট্যাক্সি নিতে হল। রাস্তাঘাট ঝাঁ চক্ চকে ও দুই ধারে সব আকাশচুম্বী অট্টালিকা, বড় বড় হোটেল, আধুনিক শপিং মল ও দোকানপাট দেখে চোখ ধাঁদিয়ে যায় । মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে আছে অসংখ্য উড়ালপুল। প্রথম দেখায় এইসব দেখে অনেকের ব্যাঙ্কক কে একটি প্রাণহীন শহর বলে মনেহতে পারে। একটু পড়লে জানা যাবে এদেশের প্রাচ্য এতিহ্যর কথা। ব্যাঙ্ককে দেবদূতের শহর বলা হয়। এই দেশের লোকজন অত্যন্ত ধর্মবিশ্বাসী।তাই শহরের প্রায় সব জায়গাতেই বৌদ্ধ মন্দির চোখে পরে। ব্যাঙ্কক মধ্য থাইল্যান্ডের ছাও ফ্রায়া নদীর ধারে অবস্থিথ। যারা প্রথমবার গেছেন ব্যাঙ্ককে তারা ঘুরে দেখে নিতে পারেন বিগ বুদ্ধ মন্দির, গোল্ডেন বুদ্ধ মন্দির, প্রমূখ। আর দেখে নেওয়া যায় ১৭৮২ সালে তৈরী রাজা রাম ১-এর আমলে তৈরী গ্র্যান্ড প্যালেস। অসামান্য স্থাপত্যশৈলীতে তৈরী এই প্যালেস যা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। এই প্রাসাদের বাইরের অংশেতেই বিখ্যাত এমারেল্ড বুদ্ধ মন্দির। কেউ চাইলে চাও ফ্রায়ার নদীর বুকে নৌকা বিহার করতে করতে থাই নাচ সহযোগে নৈশাহার সারতে পারে।
এর আগে আমি আরো দু-বার এসেছি থাইল্যান্ডে কিন্তু প্রত্যেক বার অবাক হয়েছি এদেশের উন্নতি দেখে। শুধুমাত্র পর্যটনের ওপর ভর করে কীভাবে একটা দেশের অর্থনীতি চলতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না। আমাদের ট্যাক্সি বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে এক্সপ্রেসওয়ে ধরল। গন্তব্য শুকুম্ভিত সয় -এর অ্যাম্বাসেডর হোটেল। রাস্তায় যানজট থাকায় হোটেলে পৌঁছাতে ঘন্টা দেড়েক সময় লেগে গেল। কয়েকদিন শান্ত নিরিবিলি জায়গায় কাটিয়ে হটাৎ করে ব্যাঙ্ককের আলোর রোশনাই , কোলাহল ও কংক্রিটের জঙ্গলের মাঝে পড়ে একটু কাহিল হয়ে পড়েছিলাম সকলে। ঠিক করলাম আজ আর কোথাও যাবো না। আগে বেশ কয়েকবার ব্যাঙ্কক এসেছি বলে এবার ঠিক করেছিলাম যে শুধু গুটি কয়েক জায়গাতেই যাব। রাতে একটা বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয় খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম।
পরেরদিন শনিবার থাকায় ঠিক করলাম আমরা সারাদিন ছাতুচক বাজারে কাটাবো। গতবারে বড় আফসোস হয়েছিল হাতে সময় কম পাওয়ার জন্য । বিশ্বের বৃহৎকার বাজার গুলির মধ্যে এটি একটি। ২৭ একর জমির উপর ১৫০০০ দোকানপাট নিয়ে এই সপ্তাহান্তের হাট ছাতুচক। থাইল্যান্ডের বিভিন্য প্রান্ত থেকে লোক আসে বেচা-কেনা করতে। থাই এবং বিদেশী উভয় দের জন্যই এই বাজার অতি জনপ্রিয়। এখানে বলতে গেলে সবকিছুই পাওয়া যায়। এন্টিক থেকে শুরু করে সেরামিক্স, মাটি, কাঠ, ফুল, ফল, গাছ, জামাকাপড়, স্থানীয় স্যুভেনির কি নেই। বাস, ট্যাক্সি, আন্ডার-গ্রাউন্ড ট্রেন, স্কাই ট্রেন সবই যায় সেখানে।। তবে আমরা "নানা" স্টেশন থেকে স্কাই ট্রেনে চেপে শহর দেখতে দেখতে "মোচিৎ " পৌঁছালাম সকাল ৭ টার ভেতর। এই স্টেশন থেকে হাঁটা পথে ছাতুচক বাজার। জলখাবার এখানেই সেরে শপিং করতে শুরু করে দিলাম । কি ছেড়ে কি নেব ভেবে পাচ্ছিলাম না। তবে এখানে পৌঁছেই ১ নম্বর স্টল থেকে দুটো বাজারের মানচিত্র সংগ্রহ করে নিলাম, যা আমাদের খুব সাহায্য করল ঘুরে ঘুরে কেনাকাটি করতে । প্রচুর কেনাকাটা সেরে ট্যাক্সি চড়ে ফিরে এলাম হোটেলে । পরেরদিন রবিবার তাই ঠিক করলাম আবার যাব ছাতুচক বাজারে ।
এবারে কলকাতা থেকে আসার আগেই ঠিক করে-রেখেছিলাম যে "সিয়াম নিরামিত ব্যাঙ্কক" নামে অনুষ্ঠানটা দেখে ফিরব। হোটেলের ট্রাভেল ডেস্ক, গাড়ি থেকে টিকিট সমস্ত ব্যবস্থা করে দিল সেই সন্ধেবেলা। এটা বিশ্ব বিখ্যাত অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে একটি, যা গিনিস বুকেও স্থান করে নিয়েছে । হোটেল থেকে আমাদের নিতে গাড়ি এলো ঠিক ৫.৫০ নাগাদ। বড় দল থাকলে প্রাইভেট বাসেও যাওয়া যায়, তাতে খরচটা একটু কম পরে। আমাদের মাথাপিছু ১৮০০ ভাট দিতে হলো। এতে যাতায়াত, টিকিট ছাড়াও খাবারের খরচ ধরা ছিল । আমরা ঘন্টা খানেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম রতছাদা নামে সিয়াম নির্মিত থিয়েটার প্রাঙ্গনে । দেখলাম বহু গাড়ি ও বাস এসেছে। আমাদের ড্রাইভার আমাদের জানালো যে সে আমাদের হোটেলে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এখানে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করবে শো শেষ হওয়া অব্দি। প্রধান গেট দিয়ে ঢোকার মুখেই একটি সুন্দরি মহিলা হাত জোর করে নমস্কার জানাল। পরনে সুন্দর রেশমি পোশাক ও মাথায় মুকুট, বেশ দেখতে লাগছিল। আমরাও প্রতি নমস্কার জানাতেই সে জানতে চাইলো যে আমরা তার সাথে ছবি তুলতে ইচ্ছুক কিনা। আমরা রাজি হতে ফটোগ্রাফার ছবি তুলল। বুঝলাম ট্যুরিজম ব্যবসা কত উন্নত এদেশে। এই ছবিগুলো অনুষ্ঠানের শেষে বিক্রি হয় । আমরাও কিনলাম! ফটক দিয়ে ঢুকেই সামনে বিশাল বড় উঠোন।নজর পড়ল দুটো হাতির দিকে। কেউ চাইলে হাতির পিঠে এক পাক ঘুরেও নিতে পারে। আমরা চলে গেলাম ডিনার সারতে কারন ৮ টায় শো আরম্ভ। খাবারের এলাহি ব্যবস্থা ছিল। তারাতারি খেয়ে প্রেক্ষাগৃহে এসে ঢুকলাম। তার আগে অবশ্য ওই উঠানেই একটা ছোট অনুষ্ঠান দেখে নিলাম। আমেজটা তৈরি হয়ে গেল । বিশাল হল ঘর। আমাদের আসন স্টেজের খুব কাছেই পড়েছিল। বিশ্বের বৃহত্তম স্টেজ প্রযোজনা মধ্যে এটি একটি । কি সুন্দর পোশাক আশাক, কি উন্নত মানের সেট ও কারিকুরি যা দেখে আমাদের তাক লেগে গেল। এই শো এর মাধ্যমে অতি সুন্দর ভাবে থাইল্যান্ডের ইতিহাস ও সংস্কৃতি পরিস্থাপনা করলো প্রায় ১০০ জন অংশগ্রহণকারী। মুগ্ধ হয়ে হোটেলে ফিরলাম।
পরেরদিন ভোর পাঁচটা নাগাদ আমরা রওনা হলাম ভাসমান বাজার দেখতে যাব বলে। গাড়ি আগে থাকতেই বলা ছিল। থাইল্যান্ডের ভাসমান বাজারের মধ্যে সব চাইতে বিখ্যাত দমনএন সাদুয়াক। প্রচুর পর্যটকের ভীড় ও হয় এখানে। রাস্তা মসৃন হওয়ায় আমরা ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম। রাস্তায় জলখাবার সেরে নিলাম একটি সুন্দর এলিফ্যান্ট পার্কে। এখানে দাঁতাল হাতির দাঁতে ছেপে ছবিও তুললাম। এখান থেকে রওনা দিয়ে কিছুক্ষনের মধ্যে গাড়ি এসে দাঁড়াল একটি খালের পারে। বোঝার উপায় নেই কোথায় এলাম, চারিদিকে শুধু আম, কাঁঠাল, কলার জঙ্গল। খালের ধারে আমাদের জন্য একটি মোটর চালিত নৌকা অপেক্ষা করছিল। তাতে উঠতেই আমাদের ছবি ক্যামেরা বন্দি করে রাখল একটি মেয়ে। বুঝলাম এটাও একধরণের ব্যবসা। এই ছবিটি একটি সুন্দর কাঁচের প্লেটে সাঁটকানো অবস্থায় কিনলাম ফেরার সময়। নৌকর একদম সামনে বসলাম ক্যামেরা হাতে আমি ও আমার পেছনে পর পর একেক করে তিনজন । একদম শেষে হাল ধোরে আমাদের মাঝি। এ খাল সে খাল দিয়ে ঢেউ তুলে ছুটে চলল আমাদের নৌকা। কিছুক্ষন পরে নজরে এল খালের দুই ধারে দোকান পাটের দিকে। পসরা সাজিয়ে বসে আছে দোকানিরা, অধিকাংশই মহিলা। নৌকার গতিও কমতে থাকল এই সব দোকান পাটের সামনে গিয়ে। নজরে এল খালের ধারে "কোবরা শোএর " বোর্ডের দিকে। এখানে খাল বেশ চওড়া ও আশেপাশে ছোট বড় নৌকায় পর্যটক ঠাসা। দেখলাম ছোট ছোট ডিঙি নৌকার ধাঁচে নৌকাতে চড়ে কেউ ডাব, ফল, মিষ্টি, ও নানা রকমের খাবারদাবার বিক্রি করছে, কেউ জামা কাপড়, স্যুভেনির বিক্রি করছে । ঠিক যেন একটি সুন্দর সাজানো গছানো রঙিন ছবি। আমরাও আমাদের নৌকাতে করে এদের পাশ কাটিয়ে ধীর গতিতে এগোতে থাকলাম। টুকটাক ফল কিনেও খেলাম, তবে বেশ চড়া দাম সব জিনিসের। দেখলাম এই ভাসমান বাজারের ধারে বহু লোকের বসবাস । আমরা খালের ধারে একটি মোনাস্ট্রিও ঘুরে নিলাম। সময় শেষ হতে ফিরে এলাম আমাদের গাড়ি যেখানে ছেড়েছিল সেইস্থানে । দুপুরের মধ্যে ব্যাঙ্ককে ফিরে এলাম। সন্ধেবেলা টুক টুকে চেপে পাতং ও চাইনা টাউন দেখে নিলাম।
পরেরদিন গাড়ি ভাড়া করে চিড়িয়াখানা ও সাফারি দেখে এলাম। টিকিটের মধ্যে দুপুরের খাবারের টাকা ধরা ছিল। এখানে পৌঁছাতেই আমাদের গাড়ির চালক আমাদের হাতে একটি পার্কের মানচিত্র ধরিয়ে দিল। আমরা গাড়ি করেই সাফারি তে ঢুকে পরলাম। অনেকটা আফ্রিকার গেম ফরেস্টের ক্ষুদ্র সংস্করণ। গাড়ি খুব ধীর গতিতে এগোতে লাগল। গাড়িথেকে নামা মানা। আমি সামনের আসনে বসে ছিলাম ক্যামেরা হাতে। চমকে উঠলাম যখন দুটো উঁট এগিয়ে এসে মুখ বাড়িয়ে কাঁচের উপর কি যেন দেখতে লাগল। একে একে পেলিক্যান্, জিরাফ, গন্ডার, হরিনের দেখা মিলল। আর দেখলাম গোটা পনেরো বিরাট বিরাট রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বেশ ভয় করছিল এক সাথে খোলা জায়গায় এতগুলো বাঘ দেখে। গাড়ির ভেতর বসেও হাড় হিম হয়ে যাচ্ছিল। সাফারি থেকে বেরিয়ে আমরা পায়ে হেঁটে চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখলাম। বাঘের বাচ্ছাকে কোলে নিয়ে ছবিও তুললাম এখানে।
রাতের বিমানে করে ভোর রাতে ফিরলাম কলকাতায়। খুব আনন্দ করে কাটল কয়েকটা দিন।
কিভাবে যাবেন:
কলকাতা থেকে সরাসরি বিমানে ব্যাঙ্কক পৌঁছানো যায়। আগে থাকতে টিকিট কাটলে যাতায়াত অনেক পড়বে।
কোথায় থাকবেন:
ব্যাঙ্কক -
গোল্ডেন প্যালেস হোটেল - +৬৬ ০২ ২৫২ ৫১১৫, www.goldenpalacehotel.com
হোটেল অ্যাম্বাসেডর - +৬৬ ০২ ২৫৪ ০৪৪৪, www.ambassador.bangkokshotels. com
ক্র্যাবি -
বিয়ন্ড ক্র্যাবি রিসোর্ট - +৬৬ ৭৫ ৬২৮ ৩০০, www.beyondresort.com
ক্র্যাবি রিসোর্ট - +৬৬ ৭৫ ৬৩৭ ০৩০, www.krabiresort.com
ফি ফি -
ব্যানিয়ান ভিলা - + ৬৬ ২ ৯৩৮ ৯৪৬১, www.ppbanyanvilla.com
কখন যাবেন -
ক্র্যাবি ও ফি ফি বেড়াবার সেরা সময় নভেম্বর থেকে মার্চ।
টিপস -
ব্যাংকক বিমানবন্দরে বিদেশী পর্যটকদের জন্য অন আরাইভাল ভিসার ব্যবস্থা আছে।
থাইল্যান্ডের মুদ্রার নাম বাট।
সুতির জামা কাপড়, সুইমিং কস্টিউম, ইলেকট্রনিক জিনিস কেনার আদর্শ জায়গা।
সানস্ক্রিন লোশন, রোদ চশমা, হালকা সুতির জামা, টুপি , পা খোলা চটি আবশ্যক।





