Sunday, 13 May 2018

Simla - Sarahan -Sangla - Chitkool - Kalpa - Dalash - Jalori Pass - Kullu - Manali


হিমাচল প্রদেশ রাজ্যটি আয়তনে ছোট হলেও এখানে দেখার স্থান এত বেশি যে  একবারের ছুটিতে পুরোটা বেড়ানো খুবই কঠিন। আর আমার মতো ছবি তোলার নেশা থাকলে তো আরও কঠিন । এবারে দূর্গা পূজোর ছুটি লম্বা থাকায় আমি, আমার হাজব্যান্ড ও এক বন্ধু বেরিয়ে পড়লাম সিমলার উত্তর-পূর্ব  দিকে কিন্নর-কৈলাস ও  লাহুল-স্পিতি বেড়াতে ।  হিমাচলে দশেরা উৎসব খুব বড় করে পালন করা হয়, তাই হোটেল ও গাড়ি পাওয়া মুশকিল হবে বলে আমরা কলকাতার  থেকেই   বুক করে নিয়েছিলাম। আমরা একদিন আগে হিমাচল প্রদেশের রাজধানী সিমলায় পৌঁছালাম। পরেরদিন  সকাল সকাল আমাদের চালক রাজেন্দার সিংহের (রাজু ভাই) সাথে বেরিয়ে  পড়লাম ২২ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে রামপুর হয়ে সারহান পথে ।  সিমলা থেকে  সারহানের দুরত্ব ১৭২ কিমি। HPTDC র  প্রচুর বাস চলে এই রাস্তায়।  তবে এই পথে গাড়ি নেওয়াটাই সুবিধের।  আমরা কুফরী ও তারপর নারকান্ডা   হয়ে এগিয়ে চললাম। পথে সুন্দর সুন্দর গ্রাম পড়লো।  নজরে পড়ল ধাপচাষের সৌন্দর্য্য । পথে বহুবার গাড়ি থেকে নেমেছি চোখের খিদে মেটাতে ও  অপূর্ব সব  দৃশ্য ক্যামেরা বন্দী করতে  । অনেকে নারকান্ডাতে  হাটু মাতার মন্দির দর্শন করে আসেন হাটু পিকে চড়ে। পথে শতদ্রু নদীর দেখা মিলল রামপুরের বেশ কিছু আগে কিঙ্গল বলে এক স্থানে  । বুশাহার  রাজাদের প্রাচীন রাজধানী রামপুরে পৌঁছাতে আমাদের দুপুর  একটা বেজে গেল।  সিমলা থেকে দুরত্ব ১৩৫ কিমি। রামপুর কে  বলা হয় কিন্নর রাজ্যের প্রবেশদার। শতদ্রু বয়ে চলেছে শহরের একদম পাস ঘেঁসে। রামপুর খুব ব্যস্ত জায়গা, একসময় হিমাচলের প্রাচীন বানিজ্যকেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি  ছিল।   আমরা রামপুর রাজপ্রাসাদের খুব কাছে বাজারে একটা দোতালা  রেস্তোঁরায়  দুপুরের খাবার সারলাম। এইখান থেকে লক্ষ্য করছিলাম  নিচে প্রচুর স্থানীয় লোক অপেক্ষা করছে বাসের জন্য। এখানে প্রত্যেকটি কিন্নরী মহিলা মাথায় একধরনের রুমাল পিছমোড় করে বাঁধে  ।  পরে জানলাম যে  এই রুমাল কে ওরা "ধাট্টু" বলে। আর কিন্নরী ছেলেরা মাথায় সবুজ রঙের গোল টুপি পরে।  খাবার পর আমরা রামপুরের ১৯ শতকে তৈরী পদম প্যালেসের সামনে গেলাম। বাইরে থেকেই দেখতে হবে।  প্রাসাদের দোতালাটি কাঠের তৈরি ।

রামপুর থেকে রওনা হয়ে ২৩কিমি যাবার পর জিওরি তে জাতীয় সড়ক ছেড়ে ডান দিকে চড়াই  পথ ধরলাম।  গাড়ি  পাহাড়ের নিস্তবদ্ধতা ভেদ করে উঠতে থাকলো সংকীর্ন আঁকা বাঁকা রাস্তাদিয়ে ।  নির্জন সুন্দর একটা গ্রাম সারাহান একসময় বুশাহর রাজাদের রাজ্যপাট ছিল। সারাহানের অবস্থান ৭১০০ ফিট  উচ্চতায়। শীতে প্রবল তুষারপাত হয় এখানে। সারাহানের প্রাচীন নাম শোনিতপুর। এখানে প্রধান দ্রষ্টব্য স্থান ২১৬৫ মিটার ভীমাকালী মন্দির। এটি ৫১ পীঠের একটি। এখানে সতীর কান পড়েছিল। আমাদের থাকার ব্যাবস্থা ছিল  মন্দির সংলগ্ন একটি হোটেলে।  সেদিন মহাসপ্তমী, মন্দিরে পুজো দেবো বলে আমরা বিকাল বিকাল হোটেলে  পৌঁছে স্নান সেরে নিই  । বেশ ঠান্ডা ছিল। মন্দিরটির আকার অনেকটা প্যাগোডার মত ।  মন্দিরের গায়ে কাঠ ও পাথরের অপূর্ব কারুকাজ করা। দোতালায়  রয়েছে দেবী পার্বতীর গর্ভমন্দির।  আমরা এখানে পূজা দিলাম।  তৃতীয় বা সর্বোচ্চ তলায় বুশাহর রাজাদের কুলদেবতা ভীমাকালী।  মন্দিরচত্তরে অন্যান্য দেবদেবীর মন্দিরও রয়েছে। চামড়ার জিনিসপত্র নিয়ে মন্দিরে ঢোকা নিষেধ । মাথায় টুপি বা কাপড় চাপা দিয়ে ঢুকতে  হয় মন্দিরে।  দশেরায় এখানে বড় উৎসব হয়। মন্দিরের চাতালে দাঁড়িয়ে এক ভদ্রলোক আমাদের বরফে ঢাকা ৫২২৭ মিটার উচ্চতার শ্রীখন্ডমহাদেব পর্বতের চূড়া দেখালেন। আর দেখালেন আসল মন্দিরের পাশে সেই স্থান যেখানে সতীর কান পড়েছিল।   ওখানে যাওয়া মানা। আমরা বেশ কিচুক্ষন মন্দিরচত্তরে  বসে থাকলাম । সে এক অদ্ভূত অনুভূতি।  পরেরদিন খুব ভোরে উঠে গরম জামাকাপড় চাপিয়ে ক্যামেরা কাঁধে বেরিয়ে পরলাম পায়ে হেঁটে চড়াই পথে আধ কিমি দূরে পক্ষিরালয় দেখব বলে । এখানে নানা জাতের পাহাড়ি পাখি  রয়েছে। শুধু পাখি দেখাই  নয় , এই জায়গা থেকে শ্রীখন্ড, গিসু-পিসু ইত্যাদি তুষারশৃঙ্গের  দারুন  দৃশ্য দেখা যায়,  আর তারসাথে দেখা যায় ভীমাকালী  সহ গোটা উপত্যকার অসাধারন দৃশ্য। বুশাহার রাজাদের রাজপ্রাসাদ আছে এই স্থানে। প্রবেশ নিষেধ।   এখানে এক স্থানীয় কিন্নরী মহিলার ছবি তুললাম নানান  ভঙ্গিমায় । খুশি  হয়ে সে আমার আবদার রাখলো। পরিবর্তে  সে আমার সাথে তার একটা সেল্ফি নিতে  বললো  । ভালো লাগলো দেখে যে এরা কত অল্পতে খুশি  । ফিরে এসে দেখি আমার সঙ্গী দুজন তৈরি হয়ে আমার জন্য অপেক্ষা  করছে।  স্নান সেরে তারাতাড়ি  তৈরী হয়ে নিলাম মহাঅষ্টমীর  দিনে  ভীমাকালী মন্দিরে আর একবার প্রনাম সেরে রওনা হব ফের জিওরি হয়ে পূবে  সাংলার পথে।

সিমলার থেকে সাংলার দুরত্ব ২২৬ কিমি, আর সারাহান থেকে সাংলার  দুরত্ব ৯৪ কিমি।  জিওরি থেকে আরো ৬ কিমি পূবে যাবার পর আমরা প্রকৃত কিন্নর জেলায় প্রবেশ করলাম। সেখান থেকে ওয়াংটু, টাপরি পেরিয়ে কারছাম পয়েন্টে  এসে ২২  নম্বর জাতীয় সড়ক ছেড়ে আমরা  শতদ্রুর  ওপর ব্রিজ  পেরিয়ে ডানদিকের চড়াই রাস্তা ধরলাম সাংলা যাবার জন্য। এই কারছাম  পয়েন্টে শতদ্রু আর বাসপা নদীর সঙ্গম। এখান থেকে সাংলার দুরত্ব ১৮ কিমি। এই দিকের রাস্তা যেমন ভয়ংকর দুর্গম তেমনি নৈসর্গিক।  আমাদের গাড়ির চালকের হাত যে এত পাকা তা এই রাস্তায় না এলে বোঝা যেত না।  এখানে রাস্তা খুব সরু ও খারাপ তাই ধীর গতিতে চলছে গাড়ি।  খুবই ধসপ্রবন এলাকা। বামদিকে রুক্ষ খাড়া পাহাড় আর ডানদিকে অতল খাদ, নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে  তুঁতেরঙা বাসপা নদী। নিচের দিকে চোখ গেলেই  হৃদয়-স্পন্দন থেমে যাওয়ার অবস্থা।   খাদের অপর পারেও রুক্ষ উঁচু পাহাড় আর পাহাড়ের ফাঁক-ফোকরে গুটি কয়েক  বাড়ি ঘর দেখতে পেলাম। জানিনা কি করে যাওয়া আসা করে  ওখানে থাকা মানুষজন । আমি ফটো তুলব বলে গাড়ি দাঁড় করালাম।  এখানে এত  জোরে হওয়া দিচ্ছিল যে শক্ত করে ক্যামেরা ধরে রাখাও মুশকিল হচ্ছিল আমার, তাই তারাতাড়ি উঠে পরলাম গাড়িতে ।

সম্বিত ফিরল যখন আকস্মিক চড়াই পাহাড় থেকে নেমে আমরা খোলা চওড়া  দেওদার, পাইনে ঘেরা সমতলে পৌঁছালাম । বুঝলাম সাংলার  উপত্যকায় পৌঁছেগেছি। চারিপাশ সবুজে মোড়া , বরফ ঢাকা পাহাড়ের সারি  যা ভারতবর্ষকে আলাদা করেছে  তিব্বত থেকে। বাসপা  নদী বয়ে চলেছে সাংলা উপত্যকার ওপর দিয়ে। ২৬৮০ মিটার উচ্চতার এই নয়নাভিরাম সাংলা  উপত্যকা জুড়ে রয়েছে আপেলের  বাগান।  এখানের আপেলের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। এছাড়াও সাংলায় আখরোট, চিলগোজা, নাসপাতি ফলের গাছও রয়েছে। এই  উপত্যকায় ধাপচাষের সৌন্দর্য্য  দেখার মতো। সাংলা  উপত্যকা এক কথায় অসাধারণ।

আমরা যে হোটেলে উঠলাম তার বাগানেও অনেক প্রজাতির আপেল ফলে আছে - লাল, কালচে লাল, সোনালি, হলুদ ও সবুজ রঙের। দোতলায় সুবিশাল  একটি তিন শয্যার ঘর  দিল আমাদের । দুপুরের আহারের পর আমরা ঘর সংলগ্ন ঝোলাবারান্দায় এসে দাঁড়াতেই চোখ জুড়িয়ে গেল সামনে বরফে ঢাকা নাম না জানা পর্বতমালার দিকে তাকিয়ে। আমার হাজব্যান্ড আর্টিস্ট, এই দৃশ্য দেখে  ও ছবি আঁকতে বসে পড়ল । বিকালে কিছুটা সময় কাটালাম সাংলার বাজারে। ফটো তুললাম লোকজনের। এখান থেকে অনেকে ঘুরে আসেন কামরু দুর্গ। কামাখ্যা মাতার মূর্তি আছে এই পাঁচতলা দুর্গে।  গাড়ির রাস্তা থেকে ১ কিমি পথ উঠে গেছে দুর্গ পর্যন্ত ।  ফিরে আসতে হোটেল ও বাগানের মালিক বয়স্ক ভদ্রলোক আমাদের বাগান ঘুরিয়ে দেখালেন । চোখে পড়ল স্তুপাকৃত করা আপেল।  ওনার মুখে শুনলাম এবার পুরো বাগান টাকার বিনিময় লীজে দিয়েছেন  । বাগানের মধ্যেই চলেছে আপেল ঝাড়ামোছা করে চকচক্  করে বাক্সে  ভোরে দেশ বিদেশে পাঠানোর কাজ। ভদ্রলোক আমাদের বাগান থেকে তুলে জাফরান সমেত ফুল উপহার দিলেন। বাগান যেখানে শেষ হয়েছে ঠিক সেখান থেকে খাড়া উঠে আছে কিন্নর-কৈলাস  শৃঙ্গ ।  ঘাড় তুলে আপেল গাছের উপরে তাকালে উঁকি মারে তুষারশৃঙ্গ। বেশ শীত করছিল তাই ঘরে ঢুকে পড়লাম । ঠিক হলো পরেরদিন ছিটকুল হয়ে আমরা যাব কল্পা তে।

সাংলার উত্তরে ২৬ কিমি দূরত্ব  ছিটকুল গ্রাম (উচ্চতা ৩৪৬০ মিটার)। সকাল সকাল বেরিয়ে আমাদের রকছম হয়ে  ছিটকুল পৌঁছাতে সময় লাগলো ঘন্টাখানেক। যাত্রাপথটা  অসম্ভব  সুন্দর। তুঁতেরঙা  বাসপা নদী বয়ে চলেছে উপত্যকার  বুক চিরে। নদীর দুধারে নানা রঙের খেত। রকছম -এ  পৌঁছে বাসপা নদী কে হাতের নাগালে পেয়ে গেলাম। আমরা এখানে নদীর ধারে একটি কাঠের তৈরি রেস্তোঁরায় চা খেলাম। জানলা দিয়ে চোখ পড়ল নদীর উপর কাঠের সেতুর দিকে । ঠিক যেন হাতে আঁকা  ছবি।  এক ঝাঁক পায়েরা সবুজ পাহাড়ের কোল ঘেঁসে উড়ে গেল চোখের সামনে দিয়ে।  ধীরে ধীরে চড়াই রাস্তা ধরে এগিয়ে একসময় পৌঁছে গেলাম চীন (তিব্বত) সীমান্তের দিকে ভারতের শেষ গ্রাম ছিটকুলে।  ছবির মত গ্রাম ছিটকুল। এখান  থেকে চীন সীমান্তের দূরত্ব ৩০ কিমি।  পুরো জায়গাটা উঁচু পাহাড়ে ঘেরা বাদামিরঙ্গা।   শীতে বরফ পড়ার কারণে পুরো ছিটকুলই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় কিন্নরের অন্যান্য অঞ্চলের থেকে । এখানে চিত্রলেখামাতার মন্দির ও শিবমন্দির আছে।  আমরা গাড়ি থেকে নেমে ধীর গতিতে ঢালু  পথ ধরে নদীর ধারে পৌঁছালাম। তিরৄতিরৄ  করে বয়ে চলেছে সেই তুঁতেরঙা বাসপা নদী।  নদীর দুধারে অসংখ ছোটবড় পাথর ও উঁচু তুষারশৃঙ্গ  মিলে এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে এই  স্থানের । ঠান্ডা বরফ গলা নদীর জল স্পর্শ করলাম। হটাৎ তুষারবৃষ্টি সুরু হওয়াতে  তাড়াতাড়ি    চড়াই ভেঙ্গে  গাড়ির কাছে ফিরতে বেশ বেগ পেতে হলো। চা পান করে আমরা ফেরার পথে রওনা হলাম। মনে হলো এক রাত্রি এখানে  থাকলে বেশ ভাল হত। ছিটকুলে  থাকার জন্য  আছে যাযাবর ক্যাম্প।  সাংলায় দুপুরের আহার সেরে নিয়ে কল্পা রওনা দিলাম ।

সাংলার থেকে কল্পার  দূরত্ব ৫০ কিমি।  উচ্চতা ২৯৬০ মিটার। আমরা এবার  কারছাম পয়েন্টে  এসে শতদ্রু র  ওপর ব্রিজ  পেরিয়ে ডানদিকের ২২  নম্বর জাতীয় সড়ক ধরলাম। পুয়ারি থেকে জাতীয় সড়ক ছেড়ে বাঁহাতি চড়াই রাস্তা যেটা উঠে গেছে, সেই রাস্তা ধরে রেকং পিও ছাড়িয়ে  কল্পা পৌঁছালাম।  রেকং পিও হছে কিন্নর জেলার সদর শহর। স্কুল,হাসপাতাল, হোটেল, ব্যাঙ্ক নিয়ে এটি একটি জমজমাট পাহাড়ি শহর।  রেকং পিও থেকে কল্পার দূরত্ব ১৩ কিমি। যত আমরা উপরে উঠতে লাগলাম পাইন , দেওদার গাছের মাঝ দিয়ে তত মনে হলো এই বুঝি হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করতে পারব ৬০৫০ মিটার উচ্চতার কিন্নর-কৈলাস কে। কিন্নর- কৈলাসের  কোলের কাছে কল্পা যেন এক শান্তির নীর। অতীতে এর নাম ছিল - চিনি। আমাদের হোটেলের  অবস্থান  একটি অতি সুন্দর জায়গায়, এখান  থেকে খুব কাছে দেখা যায় কিন্নর-কৈলাস সহ হিমালয়ের অন্যান্য হিমশৃঙ্গসারি ।  আমরা একটি কটেজে উঠলাম। কিন্নর-কৈলাস শৃঙ্গের খুব কাছ ঘেঁষে  ৭৯ ফুট উঁচু শিবলিঙ্গের মত দেখতে এক পাথর। প্রাচীনকালে শিবভক্ত বানাসুর নাকি এটির প্রতিষ্ঠাতা। এই পাথরটির রঙ পরিবর্তন করে দিনের বিভিন্ন  সময়।  তবে আমি শুধু  কালো আর সাদা হতে দেখেছি আর তার ছবিও তুলেছি । অনেকে পায়ে হেঁটে অগাস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ৭-৮ দিনে দুর্গম কিন্নর-কৈলাস পরিক্রমা করে । পুরো কল্পা, আপেল বাগানে ভর্তি। কল্পার গোল্ডেন আপেলের খুব খ্যাতি সারা বিশ্বে ।

আমাদের প্ল্যান ছিল পরেরদিন কল্পাতে ঘুরে লাহুল-স্পিতি যাওয়ার ।  সেখানে বিভিন্ন জায়গায় তিন রাত কাটিয়ে  কুন্জুম  ও রোটাং পাস দিয়ে মানালিতে প্রবেশ করার । সেইমত আমাদের ফ্লাইটে টিকিট  কাটা ছিল ভুন্টার (কুলুর বিমানবন্দর) থেকে। কিন্তু প্রকৃতি বিরূপ হলো।  রাতে খবর এলো কুন্জুম পাস বন্ধ হয়ে গেছে বরফ পরে। শুনলাম প্রতি বছর অক্টোবর মাসের  মাঝামাঝি সময় Govt . থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয় কুন্জুম পাস।  কিছু স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সী পারাপার করে থাকে কখনো সখনো। অগত্যা ঝুঁকি না নিয়ে সেই রাতে নতুন প্ল্যান করে ফেললাম । ঠিক করলাম পরেরদিন আমরা রামপুরে রাত কাটিয়ে প্রচলিত পথ ছেড়ে জালোরি পাস হয়ে কুলু তে  যাব । খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল।  গরম জামাকাপড় চাপিয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি সবে ভোরের আলো ফুটছে আর তার মিষ্টি কমলা রঙ লেগেছে তুষারশৃঙ্গের গায়ে।  অভিভূত হয়ে তাকিয়ে রইলাম এই নৈসর্গিক দৃশ্য-র দিকে। ক্যামেরা বন্দী করলাম বেশ কিছু ছবি।

যে পথে এসেছি সে পথ দিয়ে ফেরার আগে কল্পার কিছু দ্রষ্টব্য স্থান দেখে নেব বলে তৈরী হয়ে নিলাম তাড়াতাড়ি । দেখে নিলাম লোচাবা লাখাং নামে বৌদ্ধ গুম্ফাটি ও তারই পাশে দারুন স্থাপত্যের নারায়ন-নাগিনী মন্দিরটি ।  হাড়হিম করা সুইসাইড পয়েন্ট দেখে গেলাম হেরিটেজ গ্রাম রঘিতে  । আমরা রেকং পিও  হয়ে পুয়ারি থেকে ২২ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে চেনা পথ ধরলাম । রামপুরের খুব কাছে ডালাস নামে একটি জায়গায় সড়কের ধারে একটি ছোট হোটেলে উঠলাম। সারা পথের সঙ্গী ছিল শতদ্রু  নদী। এই হোটেলের ঠিক সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে শতদ্রু।

খুব সকালে রওনা দিলাম জালোরি পাস,  সোজা গ্রাম হয়ে  কুলু-মানালির  দিকে। এই  পথটি অতি নির্জন এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে  ভরা। পথে ধাট্টু কিনে মাথায় বাঁধলাম।  পথের ধারে কাঠের কারুকাজ করা প্রচুর বাড়ি দেখতে পেলাম  ।  পৌঁছেগেলাম ৩২২৩ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত জালোরি পাসে সকাল সকাল । ডালাস থেকে জালোরি পাস ১০০ কিমি দুরে। পাসের ওপর জালোরি মাতার মন্দির। কনকনে ঠান্ডা হওয়ার দাপট উপেক্ষা করে গাড়ি থেকে নেমে ক্যামেরা বন্দী করলাম তুষারশোভিত সারিবদ্ধ গিরির অপূর্ব দৃশ্য। এখান থেকে দেখা যায় পিরপাঞ্জল, শ্রীখন্ড, কিন্নর-কৈলাস , ধৌলাধার , প্রভৃতি  তুষারশৃঙ্গ। ডিসেম্বরের শেষ থেকে মার্চ মাস অবধি তুষারপাতের কারণে জালোরি পাস বন্ধ থাকে। এখানে আলাপ হল সদ্য বিবাহিত  কিন্নরী দম্পতি ও তাদের পরিবারের সাথে।  কিন্নরী পোশাক ও গয়না গায়ে চলেছে শ্বশুর বাড়ি কাজাতে ।   আমরা এরপর ৫ কিমি দূরের উতরাই  রাস্তা ধরে ২৬৮৩ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত সোজা গ্রামে  তির্থন নদীকে  পাশে পেলাম। এই গ্রামটিও খুব সুন্দর । রাস্তা অতন্ত্য খারাপ থাকায় খুব ধীর গতিতে চলছিল গাড়ি। এরপর বানজার, অট হয়ে ভুন্টার পৌঁছালাম দুপুর দেড়টায়। তিন কিমি দৈর্ঘের অট টানেল পার হতেই বিপাশা নদীর দর্শন মিলল। এই নদীর ধারে এক পাঞ্জাবী ধাবায় দুপুরের আহার সারলাম। কুলুতে হোটেল না পাওয়ায় ভুন্টারে এক হোটেলে উঠলাম আমরা । জালরি পাস থেকে ভুন্টারের  দূরত্ব ৬৭ কিমি।

বিকালে আমরা কুলু গেলাম দশেরার মেলা দেখতে। ভুন্টার থেকে ১০ কিমি দূরে ১২১৯ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত কুলু উপত্যকা।  কুলু উপত্যকার অবস্থান বিপাশা নদীর ধারে। কুলুর ঢালপুর ময়দানে এই মেলা বসে । হিমাচলের বিভিন্ন প্রান্তের দেবতাদের ডুলি করে নিয়ে আসা হয় এখানে ।   প্রচুর লোকে ভিড় করে এই মেলা দেখতে  ।  বড় বড় দোকানপাট, সারি সারি কুলুর বিখ্যাত শালের দোকান, হোটেল নিয়ে কুলু বেশ জমজমাট  শহর। বেশ কাটল বিকালটা আমাদের মেলা ঘুরে।

পরেরদিন  ভুন্টার থেকে দিনে দিনে  ঘুরে এলাম ৩৫ কিমি দূরত্বের মণিকরণ  থেকে ।  পার্বতী নদীর  তীর  দিয়ে কসোল, হয়ে  পৌঁছালাম মণিকরণ ঘন্টা দেড়েকের ভেতর। মণিকরণ হিন্দু ও শিখ দুই সম্প্রদায়ের কাছেই খুব পবিত্র  স্থান । রয়েছে শিব পার্বতীর মন্দির ও গুরুদ্বারা।  পার্বতীর  কানের মনিকুণ্ডল পড়ে গিয়েছিল এইখানে। আর গুরু নানক এসে কিছুদিন ছিলেন এই মণিকরণ। এখানকার উষ্ণপ্রস্রবণ খুবই বিখ্যাত।  প্রচুর মানুষকে স্নান করতে দেখলাম এই  উষ্ণপ্রস্রবণে। আর দেখলাম গরমজলে চালভরা থলি ও হাঁড়ি ডুবিয়ে ভাত বানাতে। কুলু হয়ে ফেরার পথে দেখে নিলাম বৈষ্ণোদেবী মন্দির।  এক ফ্যাক্টরি থেকে কুলুর চাদর কিনলাম নিজের ও প্রিয়জনদের দেওয়ার জন্য।

আমরা এই দিন সকালে জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম নাগ্গর হয়ে মানালির পথে । বিপাশা নদীর ওপর সেতু পার হয়ে পূব পাড়  দিয়ে কিছুদুর যাবার পর পৌঁছে গেলাম নাগ্গরে। সেখান থেকে ১ কিমি ওপরে পাহাড়চূড়ায়  রোয়েরিখ আর্ট গ্যালারিতে। রুশ শিল্পী নিকোলাস রোয়েরিখ ও তার ছেলে নাগ্গরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে থেকে গিয়েছিলেন এই বাড়িতে। তাঁদের আঁকা অসাধারণ সব ছবি দেখে মুগ্ধ হলাম।।  এখান থেকে আমি পায়ে হেঁটে ঢালু পথে ফটো তুলতে তুলতে নেমে এলাম নাগ্গরের  প্রাসাদে। আমার সঙ্গীরা এলো গাড়িতে।  কাঠের  সুন্দর কারুকার্য করা এই প্রাসাদ তৈরি করেন রাজা সিধ সিংহ। আমাদের টিকিট কাটতে হলো প্রাসাদে ঢুকতে ।  প্রাসাদের অনেকটাই এখন HPTDC হোটেলের দখলে। আমরা এখানে রেস্তোঁরায়  দুপুরের খাবার সারলাম। নাগ্গার দেখে বিপাশা  নদীর পূব পাড়  দিয়ে জগৎশুখ  হয়ে আমরা ২০ কিমি দূরত্বে মানালি পৌঁছাতে সন্ধ্যে হয়ে গেল । আমরা উঠলাম বিপাশা নদীর পশ্চিম তীরে ও ২১ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে  HPTDC র হোটেল বিয়াসে। এই হোটেল টি খুব সুন্দর  জায়গায়। হোটেলের পেছনে বাগানের ধার দিয়ে বয়ে চলেছে বিপাশা নদী।  ঘরের মধ্যে থেকেও তার গর্জন কানে আসছিল। সেদিন পায়ে হেঁটে গেলাম ম্যালে।  দোকানপাট, রেস্তোঁরা, লোকজন নিয়ে একটু ঘিঞ্জি লাগল  মানালি।

পরেরদিন কাছাকাছির মধ্যে দেখে নিলাম দেওদার গাছে ছাওয়া মনোরম স্থানে হিড়িম্বা মন্দির ও  মানালসু  নদীর ধারে ক্লাব হাউস ।  মানালি  এসে সবাই একবার  ঘুরে আসে ৫১ কিমি দুরে, ৩৯৭৮ মিটারে অবস্থিত রোটাং পাসে।  খারাপ আবহাওয়ার জন্য রোটাং বন্ধ থাকায়  আমরা  ওই  পথে পলচন  পৌঁছে বাঁদিকের রাস্তায় ঢুকে ঘুরে নিলাম সোলাং ভ্যালি। সবুজ ঘাসে ঢাকা এক সুন্দর উপত্যকা। এখানে নানা রকম এডভেঞ্চার স্পোর্টসের ব্যবস্থা আছে।  শীতে স্কি হয় এখানে।  আমি ও আমার বান্ধবী রোপওয়ে তে চড়ে  ৩২০০ মিটার উচ্চতায় পৌঁছালাম। এখান থেকে রোটাং পাস সহ অন্যান তুষারশৃঙ্গ  খুব  কাছ থেকে দেখা  যায় । এখানে বসে এক কাপ চা ও পপকর্ন খেয়ে নেমে এলাম নিচে। মানালি ফেরার পথে দেখে নিলাম বশিষ্ঠ মুনির মন্দির।  বেশ ঠান্ডা ছিল সেদিন ।  তাড়াতাড়ি  খেয়ে শুয়ে পড়লাম আমরা পরেরদিন খুব ভোরে  বেরিয়ে প্লেন ধরতে হবে বলে । সারারাত খুব ঝড় বৃষ্টি হল।

ভোরের আলো না ফুটতেই বেড়িয়ে পড়লাম ৫০ কিমি দুরের ভুন্টার বিমানবন্দর থেকে দিল্লি যাওয়ার প্লেন ধরতে। তখনো বৃষ্টি পড়ছিল। রাজু আমাদের ভুন্টার বিমানবন্দরে  নামিয়ে চলে গেল। খুবই ছোট বিমানবন্দর। খারাপ আবহাওয়ার জন্য আমাদের প্লেন ছাড়বে কিনা  সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল  ।  শেষে আবহাওয়া ভালো হতে  ঘন্টা চারেকের দেরিতে প্লেনে দিল্লি পৌঁছালাম। সেখান থেকে  আমাদের কলকাতা ফেরার প্লেন ছিল রাতে।

কোথায়  থাকবেন :

সিমলাতে -
হিমাচল প্রদেশ ট্যুরিজিমের  হোটেল হলিডে হোম ( ০১৭৭- ২৮১২৮৯০)
সিমলা কালীবাড়ি (০১৭৭ - ২৬৫২৯৬৪)
হোটেল ভিকট্রি (০১৭৭ - ২৬৫২৬০০)

সারাহানে -
হিমাচল প্রদেশ ট্যুরিজিমের  হোটেল শ্রীখন্ড (০১৭৮২ - ২৭৪২৩৪)
ভীমাকালী মন্দির কমিটির গেস্টহাউস - (০১৭৮২-২৭৪২৪৮)
হোটেল সাগরিকা - (০১৭৮২-৪০৬৬-০২৩৫)

সাংলা -
প্রকাশ রিজেন্সি - (০৯৮১৬২৮৩২৬৮)
লেক ভিউ রিসোর্ট - (০৯৮৩০১৮৯৭৭৮)


ছিটকুল -
যাযাবর ক্যাম্প - (০৯৮৭৪৩৭৩৩৮০)
মাস্তারাং ক্যাম্প - ০৯৮৩১৬ ৪২৪৫৬)
পাঞ্চালি রিসোর্ট - (০৯৮৩০২-৫৮৮২৮)

কল্পাতে -
হিমাচল প্রদেশ ট্যুরিজিমের হোটেল কিন্নর কৈলাস  (০১৭৮৬ - ২২৬১৫৯)
কিন্নর ভিলা - (০১৭৮৬-২২৬০০৬)
কৈলাস ভিউ গেস্ট হাউস - (০১৭৮৬-২২৬১৫৮)

রামপুর -
সতলুজ ভিউ গেস্ট হাউস - (০১৭৮২-২৩৩৯২৪)
হিমাচল প্রদেশ ট্যুরিজিমের হোটেল বুশাহর -(০১৭৮২ -২৩৪১০৩)

ভুন্টারে -
বালাজী ইন  (০১৯০২-২৬৫০৯৬)
হোটেল সান বিম  (০১৯০২-২৬৫১৯০)

কুলু -
হিমাচল প্রদেশ ট্যুরিজিমের হোটেল শর্বরী - (০১৯০২-২২২৪৭১)
হোটেল বিজলেশ্বর ভিউ - (০১৯০২-২২২৬৭৭)
হোটেল সবলা ইন্টারনাসানাল - (০১৯০২-২২২৮০০)

মণিকরণ -
হোটেল  সিলভার ফেস  (০৯৪১৮২-০১৯৪৭)
হোটেল শীবালিক - (০১৯০২-২৭৩৮১৭)

মানালি -
হিমাচল প্রদেশ ট্যুরিজিমের  হোটেল বিয়াস (০১৯০২-২৫২৮৩২)
হোটেল রোটাং মানালসু - (০১৯০২-২৫২৩৩২)
হিড়িম্বা কটেজ - (০১৯০২ - ২৫২৩৩৪)


কীভাবে যাবেন:

কলকাতা থেকে যেকোনো প্লেনে দিল্লি গিয়ে ওখান থেকে ট্রেনে কালকা অথবা চন্ডিগড় পৌঁছে  গাড়ি করে সিমলা পৌঁছানো যায় । দিল্লি থেকে সরাসরি প্লেন আছে সিমলার জুবারহাটি বিমানবন্দরে। হিমাচল প্রদেশে ঘোরার  জন্য গাড়িভাড়া করে নেওয়াটাই সবচেয়ে সুবিধাজনক। তাতে ঘোরার আনন্দটাও থাকবে আর সময়ও বাঁচবে। পাঁচ আসনের বড় গাড়ি নিলে ৩০০০ থেকে ৩৫০০ টাকা লাগবে দিন প্রতি।

No comments:

Post a Comment